খবর বরিশাল ডেস্ক ::
একই মাঠে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। দুই উপাসনালয়ের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলে থেমে যায় মন্দিরের ঢাক-ঢোল। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার্চনা। ধর্মীয় আচার পালনে এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজার।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে মন্দিরে যখন ব্যস্ততা বাড়ে, তখন আয়োজনের নানা কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও। অন্যদিকে মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। ধর্ম আলাদা হলেও প্রতিবেশী হিসেবে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক। দীর্ঘদিনের এই সহাবস্থানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে কোনো বিরোধের কথা জানাননি স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনেরবাড়ি সার্বজনীন দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে একই মাঠে নির্মাণ করা হয় জামে মসজিদ। এরপর থেকে পাশাপাশি দুই উপাসনালয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। সময়ের ব্যবধানে এই সহাবস্থান রূপ নিয়েছে এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যে।
মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, মসজিদে আজান শুরু হলে পূজার অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় ধর্মীয় কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। কেউ কারও ধর্মীয় আচার পালনে বাধা দেন না। বরং উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই নিজ নিজ উপাসনালয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
স্থানীয় সমাজসেবক মাকসুদ মৃধা বলেন, এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মিলেমিশে বসবাস করছেন। পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই সম্প্রীতির পরিবেশ চলে আসছে। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা মন্দিরে পূজা দেখতে যান। একইভাবে ঈদ কিংবা পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানেও অংশ নেন হিন্দু প্রতিবেশীরা। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা কখনো তাঁদের সামাজিক সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস বলেন, ১৯৭২ সালে মন্দির প্রতিষ্ঠার পর একই মাঠে মসজিদ নির্মিত হয়। দুই উপাসনালয়ের দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট হলেও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন নিয়ে কখনো কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি। পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
আধুনা শেনেরবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, এখানে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই। আজানের সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ঢাক-ঢোলের শব্দ বন্ধ রাখেন। আজান ও নামাজ শেষ হলে আবার পূজার কার্যক্রম শুরু করেন। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন।
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন, সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামের একই স্থানে মসজিদ ও মন্দিরের দীর্ঘদিনের অবস্থান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য উদাহরণ। এমন পরিবেশই কাম্য, যেখানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবেন।
মাত্র ১০ ফুটের ব্যবধান দুই উপাসনালয়কে আলাদা করে রাখলেও মানুষের মধ্যে তৈরি করতে পারেনি কোনো দূরত্ব। বরং পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে আধুনা এলাকার এই সহাবস্থান হয়ে উঠেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply