স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদে উপনির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম। ১ হাজার ২৯৫ কেন্দ্রে সবগুলোর ফলে তিনি নৌকা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৪০২ ভোট। তার নিকটতম জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাফিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৫২ হাজার ৪২৯ ভোট। বৃহস্পতিবার রাত দেড়টায় উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাশেম আতিকুল ইসলামকে ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে বেসরকারীভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান এই নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ৩১.০৫ শতাংশ।
মেয়র পদে উপনিনর্বাচনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় আতিকুল ইসলামের মেয়র পদে জয়লাভ অনেকটা নিশ্চিত হয়েছিল। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি এখন মেয়র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
এদিকে ঢাকার উত্তর সিটির মেয়র পদে উপনির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে এতে ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় বৃষ্টি স্নাত বৈরী পরিবেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। কিন্তু বৃষ্টি কারণে সকাল থেকে ভোটার উপস্থিতিতি তেমন ছিল না। দুপুর নাগাদ আবহাওয়া ভাল হলেও ভোটার উপস্থিতি খুব একটা বাড়েনি। তবে এই নির্বাচনে কোথাও কোন অপ্রীতিকতর ঘটনা ঘটেনি। ভোটার না থাকায় বেশিরভাগ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের অলস সময় পার করতে দেখা গেছে। তবে ভোটার উপস্থিতি কম হলেও ইসি সচিব জানিয়েছেন সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে ভোটের হার ৫০ শতাংশ হতে পারে উল্লেখ করেন।
তবে ভোটার উপস্থিতি কম হলেও এর দায় নিতে রাজি নয় নির্বাচন কমিশন। উত্তরার একটি কেন্দ্রে ভোট দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা ভোটারদের উপস্থিতির কময় হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন এর দায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোটের পরিবেশ তৈরি করে। তারা ভোটার কেন্দ্রে আনার দায় কমিশনের নয়। আগেই বলেছি, দুটি কারণে ভোটার উপস্থিতি কম থাকতে পারে। একটি হচ্ছে স্বল্প সময়ের জন্য এই নির্বাচন, এক বছর পরে আবার নির্বাচন হবে- সেজন্য কম হতে পারে। আর সব রাজনৈতিক দল অংশ না নেয়ায় ভোটাররা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে না ভাবলে কম হতে পারে। এ নির্বাচনের মেয়াদ অল্প দিনের। ফলে ভোটারদের আগ্রহ কম। আবার এখানে সব দল অংশ নেয়নি। এতেও উপস্থিতি কম হয়েছে উল্লেখ করেন। বেলা সাড়ে ১০টায় উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে আইইএস উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
বৃহস্পতিবার ঢাকার উত্তর সিটির মেয়র পদে ভোটগ্রহণ করা হয়। এর পাশাপাশি দুটি সিটির সম্প্রসারিত ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মেয়র পদে উপনির্বাচন হওয়ায় উত্তরের সম্প্রসারিত ১৮টি ওয়ার্ডে সাধারণ নির্বাচনের ভোটারদের মেয়র পদে ভোট ছিল না। এ কারণে মেয়র পদে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক।
মেয়র পদে উনির্বাচনে উত্তরের বিভিন্ন এলঅকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে সকাল থেকে ভোটার উপস্থিতি ছিল না। কর্ককর্তারা অসল সময় কাটিয়েছেন। রাজধানীর মিরপুর টোলারবাগে সরকারী কোয়ার্টারের ভেতরে অবস্থিত ওয়াকআপ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় স্কুল গেটে একজন নিরাপত্তা প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ভোট দেয়ার জন্য নারী পুরুষের আলাদা বুথ থাকলেও ভোটারের কোন লাইন ছিল না। বাইরে একজন টেবিল পেতে ভোটার স্লিপ দেয়ার জন্য বসে ভোটারের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সেখারে খুব কম সংখ্যক ভোটারই ভোট দিয়েছেন। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা জানান, সকাল থেকে বৃষ্টি কারণে ভোটার উপস্থিতি ছিল না। বৃষ্টি থেমে গেলে ভোটার বাড়বে। কিন্তু বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরেই ওই কেন্দ্রে কোন ভোটার খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন ভোটার ভোট দিয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
একই অবস্থা দেখা গেল মিরপুর এক নম্বরের অবস্থিত শাহ আলী বাগদাদী কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে, শাহ আলী ডিগ্রী কলেজ কেন্দ্রে। বাগদাদী কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের বাইরের কয়েকজনকে ভোটার স্লিপ দেয়া জন্য টেবিল পেতে বসে থাকতে দেখা গেলে ভোটারের দেখা মেলেনি। অপরদিকে শাহ আলী ডিগ্রী কলেজ কেন্দ্রে কাউকে ভোটের স্লিপ দিতে দেখা যায়নি। মিরপুর এক নম্বরের অবস্থিত মিরপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজনকে ভোটের লাইনে ভোট দিতে দেখা গেছে। তবে সব কেন্দ্রে সরকার সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকদের কেন্দ্রে আশপাশে আড্ডা দিতে দেখা গেছে।
গত ২৩ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদে উপনির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলেও নির্বাচনী প্রচার শুরুরেই নিরুত্তাপ পরিবেশ বিরাজ করছিল। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বর্জন করার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে কোন আগ্রহ দেখা যায়নি। ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলামসহ যেসব প্রার্থী নির্বাচনে মাঠে ছিলেন তারাও প্রচারে সরব ছিলেন না। একমাত্র আতিকুল ইসলাম ছাড়া গোটা নির্বাচনী এলাকায় অন্য কোন প্রার্থীর পোস্টার দেখা যায়নি। কোন প্রার্থীর পক্ষে মাইকিং সভা-সমাবেশ এমনকি মিছিল পর্যন্ত করতে দেখা যায়নি। ফলে প্রার্থীদের পরিচয় সম্পর্কে ভোটার অবহিত ছিল না। ভোটের দিন অনেকের এই অভিমত ব্যক্ত করতে দেয়া গেছে।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। স্ত্রী ও মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টিভেজা সকালে উত্তরার আজমপুরের নবাব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন তিনি। নিজ কেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়ার আগে ওই কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি তেমন ছিল না। ভোটারশূন্য কেন্দ্রে নিজের ভোট দিয়ে আতিকুল ইসলাম ‘গরম চা আর গরম খিচুড়ি’ খেয়ে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি জয়ে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ কেন্দ্রে তুলনামূলকভাবে ভোটার কম। এখানে শুধু মেয়রের ভোট রয়েছে। যেসব এলাকায় কাউন্সিলরদের ভোট রয়েছে তাতে উপস্থিতি ভাল হবে। সবাই আসুন, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন উল্লেখ করেন।
তবে নিজের ভোট দিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাফিন আহমেদ ভোটের কিছু অনিয়মের অভিযোগ উপস্থাপন করেন। বলেন, এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে কম। ব্যাখ্যা দিতে পারব না, তবে আশানুরূপ সাড়া দেখতে পাচ্ছি না ভোটারদের মধ্যে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে অনেক অনিয়ম হয়েছে। তাই সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ভোটাররা নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বেলা বারোটা ২০ মিনিটে গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে নিজের ভোট প্রদান করেন জতীয় পার্টির এই প্রার্থী।
এদিকে মগবাজারের ইস্পাহানি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে মাহবুব তালুকদার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে এক লিখিত বক্তব্য দেন। বলেন মেয়র নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি। অংশগ্রহণমূলক না হলে ভোটারদের উৎসাহও থাকে না। রাজনৈতিক পরিচয়ে মেয়র পদে নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল এতে অংশগ্রহণ না করায় এটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নয়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে তাতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহ দেখা যায় না। এ সময় তিনি এই নির্বাচনকে অপূর্ণাঙ্গ’ বলে আখ্যায়িত করেন।
ভোটের হার ৫০ শতাংশ হতে পারে- ইসি সচিব ॥ এদিকের মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং দুই সিটির সম্প্রসারিত ৩৬ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ভোটগ্রহণ শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ বলেন, দুই সিটির কাউন্সিলর পদের ভোট মিলিয়ে ভোটের হার ৫০ শতাংশ হতে পারে। ঢাকা উত্তর সিটির মেয়াদ আছে আর বছর খানেক। উপনির্বাচনে নির্বাচিতরা ওই পর্যন্তই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীও তেমন নেই, তাই ভোটারদের আগ্রহ কম থাকতে পারে। কিন্তু যেখানে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে ভোট বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। ভোটারদের উপস্থিতিও সেখানে ভাল ছিল।
বলেন, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। কোথাও কোন ধরনের সহিংসতা হয়নি। স্থগিতও হয়নি কোন কেন্দ্র। ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ ছাড়াও পটুয়াখালী, আমতলী, কালিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনেও শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। ইসির যুগ্মসচিব আবুল কাসেম ও জনসংযোগ পরিচালক যুগ্মসচিব এসএম আসাদুজ্জামানও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply