খবর বরিশাল ডেস্ক ::
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা। বর্ষা এলেই এখানকার বিস্তীর্ণ জলাভূমি রূপ নেয় লাল শাপলার রাজ্যে। পানির ওপর ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা দূর থেকে মনে হয় যেন জলের বুকে কেউ বিছিয়ে দিয়েছে লাল-সবুজ নকশিকাঁথা।
ভোরের আলো, মৃদু ঢেউ আর শাপলার ফাঁক দিয়ে ধীরে এগিয়ে চলা নৌকা সব মিলিয়ে সাতলার প্রকৃতি হয়ে ওঠে অপূর্ব এক দৃশ্যপট। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। শাপলা দেখতে আসা মানুষের ভিড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতিরও নতুন সম্ভাবনা।
বিলে পর্যটক বহন করে অর্ধশতাধিক নৌকা। পাশাপাশি শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করছেন স্থানীয় অনেক পরিবার। সাতলার শাপলা বিলকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে বর্তমানে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য বিলের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন তোরণ ও ভিউ পয়েন্ট।
একই সঙ্গে নৌযানে ওঠানামার সুবিধায় ঘাটলাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির কাজও চলছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর প্রায় ১৫ লাখ টাকা এবং চলতি বছর আরও ৫ লাখ টাকার উন্নয়নকাজ করা হচ্ছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়িতে দুটি ভিউ পয়েন্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িবাড়ি ভিউ পয়েন্টের তোরণ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি রয়েছে মূলত টাইলস বসানোর কাজ। প্রথম ধাপে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পর্যটকদের বসার জায়গা, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সুবিধাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাতলা বিলকে ঘিরে প্রায় ১০ হাজার একর এলাকাজুড়ে পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলের সৌন্দর্য তুলে ধরতে স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগও রয়েছে।
সাতলার শাপলা বিল এখন শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদনের জায়গা নয়, স্থানীয়দের আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শাপলার মৌসুমে বিলের চারটি এলাকায় অর্ধশতাধিক নৌকা পর্যটকদের নিয়ে ঘোরে। প্রতিদিন এসব নৌকা থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা আয় হয়।
জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস নৌকা চলাচল করলে মৌসুমে আয় দাঁড়ায় আনুমানিক ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা। স্থানীয় মাঝিরা জানান, প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার পর্যটক সাতলার বিলে আসেন। ছুটির দিন, বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়; কখনো তা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
নৌকা ভাড়ার পাশাপাশি শাপলা বিক্রিও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিলে শাপলা সংগ্রহে যুক্ত রয়েছেন শতাধিক পরিবার। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। দিনের বড় একটি সময় পানিতে নেমে শাপলা সংগ্রহ করে তারা আয় করছেন।
স্থানীয় সংগ্রাহকদের কাছ থেকে পাইকাররা শাপলা কিনে উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, কোটালীপাড়া, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ ও বরিশাল শহরের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যান। এমনকি রাজধানীর বাজারেও সাতলার শাপলা পৌঁছে যায়।
শাপলা সংগ্রহ করে স্থানীয়দের দৈনিক আয় হয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। কয়েক মাসের মৌসুমে এ আয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
এ ছাড়া পর্যটকদের কেন্দ্র করে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালক, খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয়ও বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা গীতা রানী দাস ও তার মেয়ে শর্মিলা জানান, তারা নিয়মিত বিলে নেমে শাপলা সংগ্রহ করেন।
পরে পাইকারদের কাছে তা বিক্রি করে দৈনিক প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন। বর্ষার কয়েক মাস শাপলা বিক্রির অর্থ দিয়েই তাদের সংসারের ব্যয় মেটাতে হয়।
সাতলা ইউনিয়নের এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি মূলত সন্ধ্যা নদীর প্লাবনভূমির অংশ। বর্ষায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই মাস থেকে বিলে শাপলা ফুটতে শুরু করে। নভেম্বর পর্যন্ত বিলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা যায় শাপলার আধিপত্য। লাল শাপলার পাশাপাশি কোথাও কোথাও সাদা ও বেগুনি শাপলাও দেখা যায়।
তবে ভোরের আলোয় লাল শাপলার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে দর্শনার্থীদের। নৌকায় বিল ঘুরতে গেলে চোখে পড়ে বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই ও কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। বর্ষায় যখন পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়, তখন মনে হয় শাপলার ওপর দিয়েই নৌকা ভেসে চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাতলার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শাপলা। পর্যটন বাড়ানোর নামে যদি জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সৌন্দর্যই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. এটিএম রফিকুল ইসলাম বলেন, পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নৌযান নিয়ন্ত্রণ ও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতাদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য বিলের পরিবেশ নষ্ট করছে। তাই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সাতলাকে গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পর্যটকদেরও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, সাতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই এলাকাটিকে পর্যটকবান্ধব করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে সাতলার লাল শাপলার বিল দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাবে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগও আরও বিস্তৃত হবে।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply