সৈয়দ মেহেদী হাসান অতিথি প্রতিবেদক ॥ বরিশাল মহানগরে আবারও সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে স্বাধীনতায় বিরোধীতাকারী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নাশকতার ষড়যন্ত্র ও নাশকতার চেষ্টায় পুলিশের দায়ের করা সবগুলো মামলায় জামিন পেয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ধরনের অপপ্রচার ও প্রাপগন্ডা ছড়াচ্ছে বলে বিশদ তথ্য এসেছে। এমন তথ্য পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একাধিক সদস্য জানিয়েছেন। জানা গেছে, বরিশাল নগরীতে ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে জামায়াত ও শিবিরের শীর্ষ ১০৮ নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। যদিও এর পরে নতুন করে কোন মামলায় নাম আসেনি এসব নেতাদের। ওই মামলায় প্রত্যেকেই গ্রেফতার হন। কিন্তু পর্যায়ক্রমে সবাই জামিন লাভ করেছেন। তবে বিষয়টি কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
ওদিকে সারা দেশে জামায়াতের বিরুদ্ধে নাশকতার নতুন পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। সিটিটিসির দেওয়া তথ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়, হলিআর্টিজানের মত নৃশংস হামলার ঘটনায় যারা জড়িত তাদের অধিকাংশ জামায়াত শিবিরের ছিল। এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সম্প্রতি যেসব জঙ্গি সদস্য আটক হচ্ছে তাদেরও বৃহৎ অংশ জামায়াত-শিবিরের কর্মী। সম্প্রতি নগরীর রুপাতলী বাসস্ট্যান্ডের একটি মাদরাসা থেকে জঙ্গী সদস্য আটকের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে জামায়াত। ওই মাদ্রাসাসহ রুপাতলির বেশ কয়েকটি মাদ্রাসার শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছে জামায়াতের নেতারা বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
এদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাড়ানো হয়েছে নজরদারী। জানা গেছে, সন্দেহভাজন ব্যাক্তিদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং নাশকতায় চিহ্নিতদের বিষয়ে নতুন করে খোঁজ খবর নিতে তড়িৎ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে প্রশাসনে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এবং নিয়মিত সভা করে নগরীতে আবারও মাথাচড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করছে দলের তৃণমূল। আইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই দুটির ওপর গুরুত্বারোপ করে কার্যক্রম চালাচ্ছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবী করেছে, দলে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় নগরীতে আইটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে আলাদাভাবে জামায়াত তোকর্মীদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার মিশন নিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি আবেদিত মাদরাসার কার্যক্রম পরিচালনা করছে দলটি। সেখানে শিবিরের সাবেক নেতাকর্মীরা শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করাচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহারনামীয় আসামীরা রয়েছেন।
তথ্য বলছে, নগরীতে নাশকতার অভিযোগে জামায়াত-শিবিরের ১০৮ নেতাকর্মীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমির এ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল ও মহানগর জামায়াতের রোকন এবং ২৪ নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক আঃ বারেক হাওলাদারের বিরুদ্ধে। উভয়ের বিরুদ্ধে ৬টি করে নাশকতার মামলা রয়েছে। এই দুইজন বাদে বাকি ১০৬ জনের মধ্যে কেবলমাত্র মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারী ৫টি মামলা নিয়ে জেলা হাজতে রয়েছেন জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর। এছাড়া বাকি ১০৫ জনই জামিনে রয়েছেন। জামিনের তালিকায় রয়েছে বরিশাল মহানগর ছাত্র শিবিরের সভাপতি রহমত উল্লাহ, বিএম কলেজ শিবিরের সভাপতি শাহ জালাল, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি আঃ কাদের, সেক্রেটারি মারুফ হোসেন, এয়ারপোর্ট থানা ছাত্র শিবিরের সভাপতি আক্তার হোসেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে বিভিন্ন সময়ে যারা মহানগর জামায়াত ও শিবির সক্রিয় তারাই জামিনে রয়েছেন। জামিন প্রাপ্ত বাকিরা হলেন, নায়েবে আমির বজলুর রহমান বাচ্চু, মহানগরের রোকন মিজানুর রহমান, সেক্রেটারী জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর, আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডঃ মোঃ সালাউদ্দিন মাসুম, ১০ নং ওয়ার্ডের আমির কবির তালুকদার, রোকন জিয়াউল হক, মোঃ শাহে আলম, রোকন হাবিবুর রহমান, বজলুর রহমান খন্দকার, ওলিউল্লাহ, আহম্মদ আলী, আঃ ছাত্তার, আবুল বাসার, সৈয়দ আঃ ওহাব, মোঃ আশরাফুল আলম, মোঃ সোহরাব হোসেন, বজলুর রহমান, আঃ মান্নান, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মোঃ কামাল উদ্দিন, আরাফাত হোসেন জাদু, মোঃ আঃ হাই, মোঃ আঃ বাতেন হোসেন, মোঃ হেমায়েত উদ্দিন সরদার, মোঃ আবুল হোসাইন, মোঃ রুবেল হাওলাদার, মোঃ দেলোয়ার, মোঃ গোলাম মোস্তফা, শামসুল হক খান, গোলাম সরোয়ার, আঃ আহাদ খান, মোঃ মনিরুজ্জামান মনির, শাহজাহান খলিফা সামু, মোক্তার হাওলাদার, হুমায়ূন কবির, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন মন্টু, মিলন হোসেন, শফিকুল ইসলাম, মীর সামসুল ইসলাম, আশরাফ আলী দেওয়ান, কামাল হোসেন, হাফিজুর রহমান, সাইফুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান, আঃ বারেক হাওলাদার, জাহাঙ্গীর কবির, মীর সামসুল ইসলাম, তোফাজ্জেল হোসেন, সোহেল খান, সিদ্দিকুর রহমান, ইনসান আলী, আবুল কালাম, মনিরুজ্জামান তালুকদার, আশ্রাব আলী দেওয়ান, আমানুলাহ আমান, মানিক হাওলাদার, কামাল উদ্দিন, আরাফাত হোসেন বাবু, আবুল বাসার, বেলাল হোসেন, সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান, আঃ বারেক হাওলাদার, জহিরুল ইসলাম, আঃ আলিম, মনিরুজ্জামান জামাল, আঃ রশিদ হাওলাদার। এছাড়া শিবিরের রয়েছে, নিজাম উদ্দিন, আনিসুর রহমান, রাসেল তালুকদার, নজরুল ইসলাম, সিদ্দিকুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, আঃ কাদির, মাহাবুব আলম, ফজলুল হক রাজিব, মাজাহারুল হক ভূঁইয়া, কবির হোসেন, গিয়াস উদ্দিন, সোহেল, ফয়সাল আহম্মেদ, কবির হোসেন, সোহেল, তরিকুল ইসলাম, সানাউল্লাহ মাহমুদ, খলিলুর রহমান, নুরুল ইসলাম, চান মিয়া, সোহাগ, জাকির হোসেন, দ্বীন ইসলাম, মাসুদ হাসান সজীব, হাচ নাঈম, জাকারিয়া, মেহেদী হাসান, ফয়সাল তালুকদার, তারেক আজিম উল্লাহ প্রমূখ। দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জামিনে থেকে এসব নেতাকর্মীরা দলকে সংগঠিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকার বিরোধী প্রপাগন্ডা ছড়ানো, জঙ্গীবাদি কর্মকান্ডে উদ্বুদ্ধ করার প্রাথমিক কাজও করছেন জামায়াত-শিবিরের নেতারা।
বিভিন্ন ইস্যুতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার বিরোধী ‘কথাবার্তা’ ছড়ায় বলেও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে প্রশাসন। রাজনীতি সচেতনরা বলছেন, জামায়াত কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি। ফলে তাদের অবাধ বিচরণ বিভিন্ন ধরণের উস্কানি ছড়ানোয় সহায়তা করে। অনেকই জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের দাবীও জানান।
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট একএম জাহাঙ্গীর বলেন, এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সবগুলো মামলায় জামিন পেলে জামায়াত-শিবির নতুন করে সংঘবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চেষ্টা চালাবে। আমরা সব সময় সচেতন রয়েছি জামায়াত যেন মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেজন্য। এই স্বাধীনতা বিরোধীরা যে চক্রান্ত করছে সেটিও সত্য। সুযোগ পেলেই তারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরী করতে আঘাত হানবে বলেও জানান এই নেতা।
মুক্তিযুদ্ধ একাত্তরের বরিশাল মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজল ঘোষ বলেন, বিষয়টি অত্যান্ত উদ্বেগের যে জামায়াত শিবিরের অভিযুক্ত সকল নেতারা জামিনে রয়েছে। এসব নেতাদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ প্রশাসনই পেয়েছেন। এখন সেই নাশকতাকারীরা জামিনে বের হয়ে সংঘবদ্ধ হবে-এটাই স্বাভাবিক। আর জামায়াত-শিবির সংঘবদ্ধ হয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে জঙ্গিবাদকে উস্কে দিবে। এভাবে যদি জামায়াত-শিবির নজরদারীর বাইরে থাকে তাহলে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হতে পারে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান জানিয়েছেন, জামিনলাভ একটি আইনি প্রক্রিয়া। মাহামান্য আদালত তাদের জামিন দিয়েছেন। কিন্তু তাদের কর্মকান্ড বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সবগুলো ইউনিট নজরদারীতে রেখেছে। জঙ্গিবাদ, নাশকতার বিষয়ে আমরা কোন সময়ে অসচেতন ছিরাম না। সুতরাং সংঘবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতি করবে এমন সুযোগ কেউ পাবেন না। বিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে জঙ্গি হামলা হয়নি বলে ভাবা উচিত নয় যে তারা তৎপর নয়। আমরা সেসব তৎপরতাও বন্ধ করছি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। শাহাবুদ্দিন খান বলেন, জামায়াত-শিবির জামিনে বের হলেও সরকার উৎখাত, দেশবিরোধী বা নাশকতার পরিকল্পনা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply