মজিবর রহমান নাহিদ, উজিরপুর থেকে ফিরে ॥
“আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে এই বাংলায়,
হয়তো মানুষ নয় হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে,
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঠাঁলছায়ায়”
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের অপরূপ এই বরিশালের লাল শাপলার বিলের রূপসী রূপের খ্যাতি এখন দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার সাতলা গ্রামে ১২১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের দুই পাশে বিস্তীর্ণ জলাভূমি নিয়ে গড়ে উঠেছে শাপলা বিল। আর এই শাপলা বিল দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এসে ভীর জমাচ্ছে এখানে। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এ উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা, হারতার কালবিলা, পাশ্ববর্তী আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ও খাজুরিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে এ বিল।
দূরথেকে সবুজের মধ্যে লাল রঙ দেখে চোখ জুড়ায়। দূরত্ব কমার সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ফুলের অস্তিত্ব। আগাছা আর লতা পাতায় ভরা বিলের পানিতে ফুটন্ত কোটি কোটি লাল শাপলা সত্যিই সৌন্দর্যের লীলাভূমি। প্রথম দেখায় প্রকৃতির এই নান্দনিকতা মুগ্ধ করবে যে কাউকে। অপূরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই শাপলার বিল দিন দিন কাছে টানছে প্রকৃতি প্রেমিদের। ছোট্ট ডিঙি নৌকায় ঘুরে দেখা যায় বিলের এই সৌন্দর্য। স্থানীয় বারেক সিকদার বলেন, এই শাপলা আষাঢ় মাস থেকে শুরু করে মাঘ মাস পর্যন্ত থাকে। প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে এই শাপলার বিলে। অনেক বিদেশীরাও আশে মাঝে মাঝে। শুক্র ও শনিবার মানুষ একটু বেশি আসেন। পর্যটকরা ঘুরতে আসলেও এই বিলের মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করে স্থানীয় শতশত মানুষ।
বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষেরা শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। স্থানীয় রাণী কর্মকার বলেন,আমরা গরীব মানুষ। আমরা এই শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাই। শুধু শাপলা নয় মাছেও যোগানদাতা এই শাপলা বিল। মাছ শিকার করেও সংসার চলে অনেকেরই। নানা প্রজাতির মাছ ধরা পরে এসব বিলে। আমির আলী বলেন, আমি এই বিলে মাঝ ধরে আমাদের সংসারের প্রয়োজন মেটাই। আমরা এই মাছ ধরে বাজারে বিক্রিও করি। আমার মতো অনেকেই এখানে মাছ ধরে। দিন যত যাচ্ছে ততই প্রাকৃতিক প্রেমিদের কাছে গুরুত্ব বাড়ছে এই শাপলার বিলের ফলে এক দর্শনীয় স্থানে পরিনত হচ্ছে বিলটি। তবে যাতায়াত ও থাকার সু-ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটক দিন দিন কমে যাবে বলে মত দিয়েছেন অনেক পর্যটকরা। ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা আমিরুল আরেফিন বলেন, প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি দারুণ জায়গা এটি। আমি নি:ন্দেহে বলতে পারি এখানে এসে ভ্রমণ প্রিপাষুরা তাদের তৃঞ্চা মেটাতে পারবেন। এখানের সব ঠিকঠাক আছে কিন্তু এখানে পর্যটকদের জন্য পর্যটন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে যদি থাকার কোন ব্যবস্থা থাকতো তাহলে আরও বেশি ভালো হত।
যে সময় যাবেনঃ
শাপলা বছরের ১২ মাসের প্রায় ৯ মাস। মার্চ থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত শাপলার
পুরো সিজন এখানে। তাই এ সময়ের মধ্যে গেলে শাপলা দেখতে পাবেন। শাপলা দেখার আদর্শ সময় সুবহ সাদিক থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত। এরপর শাপলা ফুল বুজে ছোট হয় যায়। তাই সবচেয়ে ভালো হয় রাতে গ্রামে থাকতে পারলে ভালো হবে। উত্তর সাতলা নানাভাবে যাওয়া যায়। লঞ্চে বরিশাল গিয়ে সেখান থেকে বাসে শিকারপুর। এরপর অটোতে উত্তর সাতলা। ঢাকা থেকে বাসে গেলে উজিরপুরের নুতনহাট নেমে সেখান থেকে অটোতে যেতে পারে। থাকতে হবে স্কুল ঘরে বা কোন গৃহস্তের বাড়িতে। অতিথিপরায়ন মানুষেরা তাতে খুশিই হবে।
কিভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে লঞ্চে বরিশাল এসে মাহিন্দ্র গাড়ীতে করে সাতলা-বাগধা গ্রামে যাওয়া যায়। বরিশাল নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে সাতলা-বাগধা গ্রামে সরাসরী বাস সার্ভিস আছে। প্রায় ২ঘন্টার মতন লাগে। সামনে নভেম্বর মাসে প্রচুর শাপলা থাকবে এই বিলে।
কিভাবে পৌঁছাবেন বরিশালেঃ
বরিশাল বিভাগীয় শহর বাংলাদেশের দক্ষিনে অবস্থিত। ঢাকার সাথে বরিশালের সড়কপথে, নদীপথে এবং আকাশ পথে যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে। ঢাকা থেকে বরিশালে সড়কপথে আপনি ৬ থেকে ৮ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন। প্রতিদিন ভোর ৬ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে বেশকিছু বাস বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বেশীরভাগ বাস পাটুরিয়া ঘাট অতিক্রম করে বরিশালে যায় আবার কিছু কিছু বাস মাওয়া ঘাট অতিক্রম করে বরিশালে যায়। ঢাকা থেকে আগত বাসগুলো বরিশালের নতুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে থেমে থাকে। এছাড়া ঢাকা সদর ঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে ৪-৫টি লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
বরিশালে থাকার জন্য বেশকিছু হোটেল রয়েছে। কিছু হোটেলের তথ্য আপনার সুবিধার্থে নিম্নে প্রদান করা হলঃ
হোটেল গ্রান্ড পার্ক, ফোনঃ +৮৮০ ৪৩১-৭১৫০৮
হোটেল এরিনা, ফোনঃ +৮৮০ ১৭৭৯-০৫১১০৬
হোটেল স্যাডোনা, ফোনঃ +৮৮০ ১৭০৫-২৯৩৮৭৮
হোটেল প্যারাডাইজ টু ইন্টারন্যাশনাল, ফোনঃ +৮৮-০১৭১৭০৭২৬৮৬, +৮৮-০১৭২৪৮৫৩৫৯০
হোটেল গ্র্যান্ড প্লাজা, ফোনঃ +৮৮-০১৭১১৩৫৭৩১৮, +৮৮-০১৯১৭৪৫৮০৮৮
হোটেল এথেনা ইন্টারন্যাশনাল, ফোনঃ +৮৮-০৪৩১-৬৫১০৯, +৮৮-০৪৩১-৬৫২৩৩
হোটেল হক ইন্টারন্যাশনাল, ফোনঃ +৮৮-০১৭১৮৫৮৭৬৯৮
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply