বৃহস্পতিবার, ১৩ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৬:১১

বরিশালে বেতন চাইতেই শ্রমিকদের উপর গুলি

dynamic-sidebar

মেহেদী হাসান ॥ বকেয়া বেতন পরিশোধ করার দাবীতে বরিশালে জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফরচুন সুজ লিমিটেডের কারখানায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কারখানা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কারখানার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা শ্রমিকদের ওপর গুলি করেছেন। আর এ হামলার ঘটনায় মুহুর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিনত হয় গোটা বিসিক শিল্প এলাকা। গুলিতে আহত শ্রমিকরা বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

 

আহত শ্রমিকরা হলেন উজিরপুরের নারায়নপুর এলাকার হানিফ সরদারের ছেলে মেহেদি (২৫), বাবুগঞ্জের রহমতপুর এলাকার মো. মোস্তফার ছেলে রাজিব (২৫), স্বরূপকাঠির মো. শামসুদ্দোহার ছেলে তামিম (২০), নলছিটির গোবিন্দপুর গ্রামের মো. খোকনের ছেলে রাফসান (২০) ও গাইবান্ধার রসুলপুরের মিজানুর রহমান (২০)। অপরদিকে শ্রমিকদের ছোড়া ইট-পাটকেলের আঘাতে কাউনিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান এবং পাঁচ আনসার সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় বরিশাল বিসিক কম্পাউন্ডে অবস্থিত কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। কারখানাটি বিপিএলে ফরচুন বরিশাল টিমের মালিক ও বিসিক শিল্পনগরী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমানের।

 

আন্দোলনকারী শ্রমিক নিপা বলেন, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কথা দিয়েছিল প্রতি মাসের ৮ তারিখের মধ্যে বেতন দেবে। কিন্তু তা না দিয়ে এক মাসের বেতন পরের মাসের ২৫ তারিখেরও পরে দেয়। আমরা ফরচুন সুজের কাছে দুই মাসের বেতন পাব। আজকে (বৃহস্পতিবার) সেই বেতন চাইতে গেলে কোম্পানি দুই মাসের বেতন না দিয়ে ১৫ দিনের বেতন দিতে রাজি হয়। এতে কিছু শ্রমিক কারখানা থেকে বেড় হয়ে যেতে চাইলে আনসার সদস্যরা বাধা দেন। তারা শ্রমিকদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে মারধর করেন। মারধরের এক পর্যায়ে গুলিও করেন আনসার সদস্যরা।

শ্রমিক হাফিজুল বলেন, দুই মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বৃহস্পতিবার আমাদের আধা মাসের বেতন দিয়েছে। শ্রমিকরা বলছে ফুল বেতন লাগবে। এ মাসে না, পরে দেখা যাবে। এ নিয়ে কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে ফ্যাক্টরির কর্মকর্তারা শ্রমিকদের মেরেছেন। আমরা প্রতিবাদ করলে আনসাররা গুলি করে। সকল শ্রমিকদের মারধর করেছে। হাফিজুলের দাবি, তিন ফ্যাক্টরির অন্তত বহু শ্রমিক আহত হয়েছেন। তারা ফরচুন সু কোম্পানির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজানের ভয়ে অনেকে হাসপাতালে আসেননি।

অন্য শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, মাসের ১০ তারিখ বেতন দেওয়ার কথা বলে আমাদের চাকরি দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি কখনও। প্রথম দিকে মাসের ১৫ তারিখে বেতন দিত। সেখান থেকে যায় ২০ তারিখে। আর এ মাসে তো ২৩ তারিখ পার হলেও বেতন পায়নি কোনো শ্রমিকই। মাস শেষে এখন বলা হচ্ছে অর্ধেক বেতন নেওয়ার কথা, বাকি অর্ধেক আগামী মাসের ৩০ তারিখে দেওয়ার কথা বলছে।
শ্রমিকরা আরও বলেন, পেটের ক্ষুধায় চাকরিতে এসে দুই মাস শেষে যদি হাফ বেতন দেয় তাহলে কীভাবে ঘরভাড়া দেব, দোকানের বকেয়া পরিশোধ করব? তারা তো আমাদের মারবে। আর সেই টাকা চাইতে গিয়ে আমাদের মারধর করা হয়েছে, গুলি করা হয়েছে।

আন্দোলনকারী শ্রমিক ইউনুস বলেন, মাসের ২৩ তারিখ হলেও বেতনের খবর নেই। এখন বেতন চাইতে গিয়ে আমাদের ওপর গুলি চালানো হলো। ৪/৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। শ্রমিকদের যখন মারধর করে তখন ফরচুন সুজের মালিক পক্ষের লোকজন ঘটনাস্থলে ছিল। তারাই আনসারদের শিখিয়ে দিয়েছেন বেতন চাইলে গুলি করবি!

শ্রমিক নাসরিন বলেন, বেতন চেয়েছি, বেতন দেবে না। ভালো কথা, কিন্তু আমার শ্রমিক ভাইদের মারবে কেন? নিচতলায় গেটের কাছে সহকর্মীদের ওপর হামলার খবর শুনে ভেতরের বিভিন্ন তলা থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে আসতে চাইলেও প্রথমে মালিকপক্ষের লোকজন ও কর্মকর্তারা দেয়নি। তারা নানানভাবে আমাদের গালিগালাজ করেন। পরে সবাই জড়ো হয়ে কারখানার গেটে বিক্ষোভ ও মিছিল করেছি। তখন হয়তো অতি উৎসাহী কেউ কেউ কারখানায় ইট মেরে জানালার গ্লাস ভেঙেছে, শ্রমিকরা কোনো হামলার ঘটনা ঘটায়নি।

তবে ফরচুন সুজের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য (এপিসি) ইউসুফ আলী বলেন, শ্রমিকরা কারখানার কাছে বেতন পাবে। তারা আন্দোলনে নেমে প্রথমেই এসে অতর্কিতভাবে আমাদের আনসার সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। পুরো ক্যাম্পে হামলা-ভাঙচুর চালিয়ে মোবাইল, টাকা পয়সা নিয়ে যায় শ্রমিকরা। পরে তারা ম্যাগাজিন রুমে হামলা চালাতে গেলে উপরের নির্দেশক্রমে আমরা ফায়ার করেছি।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের হামলায় আমাদের ৫-৭ জন সদস্য আহত হয়েছেন, আমরা বাইরে গিয়ে কোনো গুলি করিনি। শ্রমিকরা ম্যাগাজিন রুমে হামলা করতে এলে আমরা উপরের নির্দেশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ১০ রাউন্ড গুলি করি। গুলিতে শ্রমিকরা হতাহত হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন ফরচুন সুজের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য ইউসুফ আলী।

এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়ে কারখানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। এমনকি কারখানার ভেতরে কিছু হওয়ার খবরও তাদের জানা নেই বলে দাবি করেন।
এসময় ফ্যাক্টরির সামনে থাকা ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আউয়াল মোল্লা বলেন, ফরচুনের বাইরের (বিদেশের) সাথে ব্যবসা। বাইর থেকে টাকা পেয়ে বেতন দেয়। বেতনভাতা নিয়ে একটা ঘটনা ঘটেছে। ১৫ দিনের বেতন দিয়েছে। শ্রমিকরা ওই টাকা দিয়ে কী করবে? বেতন ঠিকমতো না দেওয়ায় শ্রমিক আন্দোলন শুরু করেছেন। কাউন্সিলরের অভিযোগ শ্রমিকরা ঠিকমতো বেতন-বোনাস পান না। ওভার টাইমের টাকাও ঠিকমতো দেয় না। তিনি বলেন, শ্রমিকদের মধ্যে চারজন মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন। আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই।

কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি শান্ত আছে। মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মনদীপ ঘরাই। এসময় তিনি উপস্থিত শ্রমিকদের শান্ত হতে বলেন এবং মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে সঠিক সমাধান করবেন বলে আশ্বাস দেন।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All Rights reserved © 2018 KhoborBarisal.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net