শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১২:০৯

শিরোনাম :
লাল ফিতা কেটে বাঁশের সাঁকো উদ্বোধন করলেন বিএনপি নেতা, সমালোচনার ঝড় টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক উজিরপুরে খাল খনন প্রকল্পের উদ্বৃত্ত ৬০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত বাকেরগঞ্জে বৈদ্যুতিক তার চোরের উৎপাত, বাদ যাচ্ছে না ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বরিশালে নতুন পুলিশ কমিশনার আবু রায়হানের যোগদান বরিশালে র‌্যাবের চেকপোস্টে যাত্রীবাহী বাস থেকে মাদকসহ আটক ১ শিবির করায় ববির চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীকে ছাত্রদলের মারধর অতপর চাকরিচ্যুত বরিশালের ‘গডফাদার’ হাসানাত আব্দুল্লাহ এখন কোথায়? বরিশাল থেকে যেন কোন রোগীকে ঢাকায় যেতে না হয়: ড. জিয়া উদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে পবিপ্রবি ছাত্রদলের অংশগ্রহণ
মাধবপাশায় শিক্ষার্থীদের ঢাল বানিয়ে অধ্যক্ষকে অপসারণ করতে চায় স্বার্থান্বেষী মহল

মাধবপাশায় শিক্ষার্থীদের ঢাল বানিয়ে অধ্যক্ষকে অপসারণ করতে চায় স্বার্থান্বেষী মহল

dynamic-sidebar

স্টাফ রিপোর্টারঃ শিক্ষক, এই একটি শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক অমূল্য দায়িত্ব ও মহান ব্যক্তিত্ব। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক। তিনি আমাদের আলোর দিশা দেখান, সঠিক ও ভুলের পার্থক্য শেখান। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় আমাদের জীবনের যাত্রা। শিক্ষক হলেন জ্ঞানের প্রদীপ, যিনি অন্ধকারে আলোর দিশা দেখান। তাঁর কাছ থেকে আমরা শুধু পাঠশালার শিক্ষা নয়, জীবনের আসল মন্ত্র শিখি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কখনো কখনো সেই মহান মানুষদের সম্মানহানি হয়।

 

এটা শুধু একজন শিক্ষকের অপমান নয়, পুরো সমাজের জন্যই লজ্জার বিষয়। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে সংস্কারের দাবী ওঠে। সেই সংস্কারে বাদ পরেনি বিভিন্ন স্কুল কলেজের প্রধান শিক্ষক এবং অধ্যক্ষরাও। তবে, গুটি কয়েকজন প্রধান শিক্ষক এবং অধ্যক্ষের কর্মকাণ্ডের মাশুল দিতে হচ্ছে নিরপরাধ শিক্ষকদের। সম্প্রতি, বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের চন্দ্রদীপ স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রণব কুমার এর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে কিছু শিক্ষার্থী। অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবি তুলে তারা তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পেছনে মূল কারণ হচ্ছে পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের পাশ না করানোর সিদ্ধান্ত এবং শ্রেনী কক্ষে দেশীয় অস্ত্রসহ এক শিক্ষার্থী ধরা পরলে তাকে বহিস্কার করা। এর ফলস্বরূপ, ওই শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা অভিযোগ তোলেন।

এবিষয়ে বিক্ষোভে অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দেয়া দশম শ্রেনীর বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা মূলত অধ্যক্ষের দুর্নীতির বিষয়ে শুনেছেন। তাদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়ার ব্যাপারেও সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেনি বিক্ষোভ করা শিক্ষার্থীরা। সৈকত হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী জানায়, আমরা নবম শ্রেনীর প্রিটেস্ট পরিক্ষায় খারাপ করলে প্রধান শিক্ষক আমাদের গার্জিয়ানদের ডেকে ফেল করা সাবজেক্টের জন্য টাকা চাইতেন।টাকা না দিতে পারলে আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন এবং আমাদের পরবর্তী ক্লাসে ওঠার সুযোগ দিতেন না। শিক্ষার্থী বহিস্কারের বিষয়ে অমিত হাসান নামের এক শিক্ষার্থী জানায়,প্রতিষ্ঠানের গাছে তাল, ডাব খাওয়ার জন্য একটি দাও নিয়ে ছেলেটি আসছিলো আর সেইটার ওজুহাত দিয়ে তাকে বহিস্কার করা হয়।

এদিকে,চাকরি হারানোর ভয়ে এবিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো শিক্ষক গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। তবে, অনেক অনুরোধের পর প্রতিষ্ঠানটির সহকারি শিক্ষক গাজী জাফর বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হলে প্রধান শিক্ষক অথবা অধ্যক্ষের একটু কঠোর হতেই হয়। হয়তো তিনি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই কঠোর থাকতেন। তবে, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিষয়ে আমার তেমন কিছুই জানা নেই। তিনি আরও বলেন,এক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে একটি ধারালো অস্ত্রসহ হাতেনাতে ধরে ক্লাস শিক্ষক। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির উপস্থিতিতে তার গার্জিয়ান ডেকে তাকে বহিস্কার করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, সরকার পতনের পর বিভিন্ন স্থানে অধ্যক্ষদের পদত্যাগ করার যে হিড়িক চলছিলো। সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল শিক্ষার্থীদের কাজে লাগিয়েছে।

 

তিনি বলেন, আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্ত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী। যারা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ছিলো, তাদের মধ্যে বেশীরভাগ নবম শ্রেনীর প্রাক-বাছনিক পরিক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থী। যাদেরকে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে মূল পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেননি অধ্যক্ষ স্যার। আর সেই ক্ষোভ থেকেই তাদেরকে ব্যবহার করছে স্বার্থান্বেষী মহল। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের চাকুরী জীবনে প্রণব কুমার স্যার প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে একটু কঠোর ছিলেন। আর তার এই কঠোর সিদ্ধান্তগুলোই হয়তো কাল হয়ে দাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন করা এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক সুসংহত করার দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। এতে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে এবং অব্যাহত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

মাধবপাশা চন্দ্রদীপ হাইস্কুল ও কলেজের অফিস সহকারী নাজমুল বলেন, প্রণব স্যার কখনো আমাদের সাথে খারাপ আচরন করেননি। তিনি সবসময় আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমাদের এখানে শিক্ষার্থীদের থেকে যদি কোনো টাকা নেয়া হয় তার জন্য সাথে সাথে রিসিভ কপি তাদের দেয়া হয়। এখানে অতিরিক্ত টাকা নেয়া কোনো ভাবেই সম্ভব না। যদি কোন টাকা নেয়া হয় সেটারও প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ রয়েছে।

 

যানাযায়, ২০০৪ সালে মাধবপাশা চন্দ্রদীপ হাইস্কুল ও কলেজের যোগদান করেন প্রণব কুমার বেপারী। সেই থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। বিভিন্ন দপ্তর ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ২০২৩ সালে মাধবপাশা চন্দ্রদীপ হাইস্কুল ও কলেজটি এমপিও ভুক্ত করতে সক্ষম হন অধ্যক্ষ প্রণব কুমার।

 

এবিষয়ে মাধবপাশা চন্দ্রদীপ হাইস্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ প্রণব কুমার বেপারী বলেন,আমার জীবনের সকল স্বাদ আল্লাদ বিসর্জন দিয়ে আমি সর্বক্ষণ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সেই ২০২৪ সাল থেকে কাজ করে আসছি। দীর্ঘ এতো বছরের চাকরি জীবনে আমি কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করিনি। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হলেও আমি অন্যান্য শিক্ষক অথবা শিক্ষার্থীদের বুঝতে না দিয়ে নিজেই সমাধান করার চেষ্টা করেছি। কারণ ,এতে তাদের পড়াশোনায় প্রভাব পরতো।

 

আমার বিরুদ্ধে তারা দুর্নীতির যে অভিযোগ তুলেছেন,যদি সেরকম কিছু করতাম তাহলে দীর্ঘ ২০ বছর একই স্কুলে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, আমার যদি অন্যায় হয় অবশ্যই আমার শাস্তি হোক। কিন্তু শুধু শুধু কারোর স্বার্থ হাসিলের উদ্দ্যেশ্যে শিক্ষার্থীদের দিয়ে আমার বিরুদ্ধে যে নোংরা কর্মকাণ্ড করানো হয়েছে আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

সম্প্রতিকালীন এসকল বিষয় নিয়ে কথা হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়কের সাথে। তিনি বলেন, একজন শিক্ষককে সম্মান দেওয়া মানে নিজের ভবিষ্যতকে সম্মান করা। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে না পারলে, আমরা কখনো সত্যিকার শিক্ষিত হতে পারবো না। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান চিরকাল অটুট থাকুক। তিনি আরও বলেন, আমাদের জীবনের প্রতিটি সাফল্যের পিছনে একজন শিক্ষকের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থাকে।

আমরা যখন জীবনে বড় কিছু হয়ে উঠি, আমাদের পিছনে থাকে সেই শিক্ষকের অসীম সহনশীলতা, সহানুভূতি আর ধৈর্য। শিক্ষকদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা যেন আজীবন অটুট থাকে। তাঁরাই তো আমাদের জীবনের স্থপতি। শিক্ষা ও মূল্যবোধের সেই অমর সৈনিকদের প্রতি জানাই গভীর সম্মান।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All Rights reserved © 2018 KhoborBarisal.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net