বুধবার, ৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১:৩৫

লঞ্চ চাঁপায় স্বামীর মৃত্যু, বেঁচে যাওয়া অন্তঃস্বত্ত্বা গৃহবধূর কোলজুড়ে জন্ম নিল পুত্র সন্তান

লঞ্চ চাঁপায় স্বামীর মৃত্যু, বেঁচে যাওয়া অন্তঃস্বত্ত্বা গৃহবধূর কোলজুড়ে জন্ম নিল পুত্র সন্তান

dynamic-sidebar

গত ইদ-উল ফিতরের আগমুহুর্তে লঞ্চযোগে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চ চাঁপায় নিহত সোহেলের স্ত্রীর কোলজুড়ে জন্ম নিয়েছে ফুটফুটে পুত্র সন্তান। বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকায় বাবার বাড়িতে পুত্র সন্তান প্রসব করেন নূর আফরিন রুবা।

দুর্ঘটনায় স্বামী-শ্বশুর হারা রুবার পাশে দাঁড়ায়নি স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধি। দুর্ঘটনার তিন মাস কেটে গেলেও ক্ষতিপূরণের টাকাই তিনি পাননি। তার ওপর ঢাকায় মেয়েকে চিকিৎসার জন্য দিনমজুর বাবার করা দেনা পরিশোধ করবেন কী দিয়ে, সে নিয়েও হতাশ সদ্য মা হওয়া রুবা।

সূত্রমতে, চলতি বছরের ১৮ মার্চ (২৮ রমজান) স্বজনদের সাথে ঈদ-উল ফিতরের ঈদ উদযাপনের জন্য অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী নূর আফরিন রুবা এবং বাবা মিরাজ ফকিরকে নিয়ে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ান হয়েছিলেন সোহেল ফকির (২২)।

ঢাকার সদরঘাটে ট্রলারযোগে এমভি আসা-যাওয়া-৫ লঞ্চের ওঠার সময় অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। তখন স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে করুণ মৃত্যু হয় সোহেল ও তার বাবা মিরাজ ফকিরের। এসময় ট্রলার থেকে পরে গিয়ে হাত-পা ভেঙে যায় সোহেলের অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী নূর আফরিন রুবার। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে। দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ঢাকায় চিকিৎসা শেষে এক মাস আগে বরিশাল নগরীর কাশিপুরে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন রুবা। সেখানে গত ৯ জুন ভোরে পুত্র সন্তান প্রসব করেন তিনি। বর্তমানে মা রুবা ও তার নবজাতক সন্তান দুইজনেই সুস্থ্য আছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুবা বলেন, অনাগত সন্তান নিয়ে সোহেলের অনেক স্বপ্ন ছিল। আজ সোহেল বেঁচে থাকলে সন্তান জন্মের খবরে সে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। সে মৃত্যুর আগেই ছেলে বা মেয়ে হলে তাদের নামও ঠিক করে রেখেছিল। বলেছিল পুত্র সন্তান হলে তার নাম রাখবেন ‘রাইয়ান ইসলাম’। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার নাম রাইয়ান ইসলাম রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, এখনতো সোহেল নেই। তার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার ওপর। কিন্তু আমি নিজেই যে পা হারিয়ে পঙ্গু। আমার পায়ের মধ্যে এখনো রড ঢোকানো। বিছানা থেকে নামা একেবারেই নিষেধ। তার ওপর বুকের দুধ হয় না, বাচ্চাকে বাজার থেকে দুধ ক্রয় করে খাওয়াতে হচ্ছে। সোহেলের স্বপ্ন ছিল ছেলেকে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাবে। কষ্ট হলেও আমি তার সেই ইচ্ছা পূরণ করবো। এজন্য সরকারের কাছে একটি চাকরির দাবি করেছেন অসহায় রুবা।

রুবার মা সালমা আক্তার সাথী বলেন, ঢাকায় মেয়ের পায়ের অপারেশন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য যে খরচ সেটা নৌ-প্রতিমন্ত্রী দিয়েছেন শুনেছি। কিন্তু এরপরেও আমাদের প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমি একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চাকরি করি। আমার স্বামী দিনমজুর। দেনা করে সন্তানের চিকিৎসা চালিয়েছি। এরমধ্যে কেউ একবারের জন্য খবরও নেয়নি। এমনকি দুর্ঘটনার পর লঞ্চ মালিকদের পক্ষ থেকে যে টাকা দেওয়ার কথা সে টাকাও পাইনি। বিআইডব্লিউটিএতে যোগাযোগ করা হলে তারা আজ না-কাল দেবে বলে ঘুরাচ্ছে।

রুবার দিনমজুর বাবা রিয়াজ উদ্দিন মীর বলেন, আমি দিনমজুর। কাজ পেলে বাজার হয়, না হলে ঘরের চুলা জ্বলে না। তার ওপর মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে দেড় লাখ টাকা ঋণ হয়েছি। এগুলো পরিশোধ কিভাবে করবো তা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু মেয়ে-নাতি তাদেরও ফেলে দেওয়া যাবেনা। এজন্য সরকারি সাহায্য সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান কিংবা দানশীল সংগঠকদের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি।

একদিকে নবজাতকের কান্না, অন্যদিকে দুই প্রিয়জনের কবর, এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করেছে সোহেল ফকিরের অসহায় স্ত্রী নূর আফরিন রুবা। শিশুটি পৃথিবীতে এসেছে নতুন আশার আলো হয়ে কিন্তু সেই আলোকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের সহমর্মিতা।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All Rights reserved © 2018 KhoborBarisal.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net