খবর বরিশাল ডেস্ক : সরকারি হিসেবের বাহিরে বরিশাল নগরীতে কয়েকগুণ বেড়েছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা। এসব যান চার্জ দিতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৬২ লাখ টাকার বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। ফলে তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে বাড়তি চাঁপ তৈরি হয়েছে। যা জনজীবনে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের হিসেব অনুযায়ী, ইজিবাইকের সংখ্যা সাত হাজার ছয়শ’ হলেও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এই সংখ্যা ৩০ হাজারের অধিক। এরসাথে যুক্ত হয়েছে আরও অন্তত ৪০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা। অর্থাৎ সরকারি অনুমোদনের বাহিরে কয়েকগুণ বেশি যান চলাচল করায় এর কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসেব বা নিয়ন্ত্রণ নেই।
সূত্রে আরও জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারে কতোটা বাণিজ্যিক মিটারের মাধ্যমে হচ্ছে আর কতোটা অবৈধ বা আবাসিক সংযোগে, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। ওজোপাডিকোর দুই অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীরা ১২৭টি গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার থাকার কথা বললেও কর্মচারীদের দাবি, প্রায় দুইশ’ গ্যারেজে মিটার ছাড়াই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। গভীর রাতে মূল লাইনে হুক লাগিয়ে বা আবাসিক মিটারে অবৈধভাবে চার্জ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
নগরীর কাউনিয়া, নবগ্রাম রোড, ভাটিখানা, বটতলা, কেডিসি কলোনি, স্টেডিয়াম কলোনি, জিয়া সড়ক, নতুন বাজার, রূপাতলী, ধান গবেষণা রোড, চাঁদমারী, পলাশপুর ও আমানতগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। দিনের বেলায় এসব গ্যারেজে রিকশা ও ইজিবাইক রাখা হয়। রাত গভীর হলে শুরু হয় ব্যাটারি চার্জ।
কয়েকটি গ্যারেজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবাসিক মিটারে বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে। কোথাও আবার বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নেওয়ার কথাও গ্যারেজ মালিকরা স্বীকার করেছেন। নগরীর স্টেডিয়াম কলোনির এক গ্যারেজ মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয় বিদ্যুতের লোকজনকে, যাতে লাইন কেটে না দেয়। সামান্য এই ঘুষের মাধ্যমে আমরা আবাসিক মিটার ব্যবহার করি। এতে কম খরচে বেশি যানবাহন চার্জ দিতে পারি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিক এলাকার আরেক গ্যারেজ মালিক বলেন, বেশি ব্যবসার জন্য রাত একটার পর মেইন লাইনের সাথে হুক দিয়ে দিই। এতে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। মিটার রিডারকে মাঝে মধ্যে কিছু টাকা দিয়ে থাকি। গ্যারেজে ১৮ থেকে ২০টি ব্যাটারিচালিত যান রয়েছে। এতে অনেক খরচ বেঁচে যায়।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দাবি, বরিশাল বিভাগে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অনিয়ম ও অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে গত ছয় মাসে তারা ৬৮১টি মামলা করেছেন। এসব মামলায় প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
ওজোপাডিকোর তথ্যানুযায়ী, আবাসিক মিটার ব্যবহার করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও বিদ্যুৎ চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে বিদ্যুৎ চুরির ঘটনায় তিনজনকে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঘটনায় আদায় করা হয়েছে ২৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা।
ওজোপাডিকো-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আমার আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৮০টি গ্যারেজ কাম চার্জিং স্টেশনে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে। আবাসিক মিটার ব্যবহার করে কেউ ব্যাটারি চার্জ করছে, এমন তথ্য পেলে তাৎক্ষনিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ওজোপাডিকো-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার জানান, আমার আওতাধীন এলাকায় ৪৭টি গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে। অনিয়ম হলে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়।
সূত্রমতে, বরিশাল নগরীর বিদ্যুৎ চাহিদা প্রতিদিন ৭০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী এর বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ৫৪ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এই ঘাটতির মধ্যে রাতভর হাজার হাজার ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে। সচেতন নগরবাসী বলছেন, এর প্রভাব পরছে তাদের দৈনন্দিন জীবনে।
ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ বরিশালের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. গোলাম সালেহ আহমেদ ছালেম জানিয়েছেন, ৭০ হাজার ব্যাটারিচালিত যান চার্জ করতে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। এতো বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার নগরীর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাঁপ তৈরি করছে। এমন অবস্থায় গ্রাহকরা সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ পেতে চাইলে ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলোতে চার্জ করতে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্টদের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে যদি ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলোর সোলার সিস্টেম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ নিয়ে সকল সমস্যার ৯০ ভাগ সমাধান হয়ে যাবে।
সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র বরিশাল মহানগর কমিটির সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক নগরীর মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাই এগুলো একদিনে বন্ধ করার বাস্তবতা নেই। কিন্তু যানগুলোর সংখ্যা, নিবন্ধন, রুট, চার্জিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এর চাপ শেষ পর্যন্ত পরছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর। তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আনা জরুরি। সিটি করপোরেশন এ যানগুলোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বিদ্যুৎ সংকটের ওপর চাঁপ কিছুটা হলেও কমবে।
ওজোপাডিকো (পরিচালন ও সংরক্ষণ) বরিশাল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরিতোষ চন্দ্র সরকার বলেন, বরিশাল নগরীর আয়তনের তুলনায় যে পরিমাণ অটোরিকশা রয়েছে, তা দেশের অন্য কোনো শহরে নেই। আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। যদি কোথাও ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জ করতে কেউ অবৈধ পথ বেঁছে নেয়, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত যানবাহন বিদ্যুৎ সংকটে বাড়তি চাঁপ তৈরি করছে। নগরীতে প্রথমে পাঁচ হাজার, পরে আরও ২৬শ’ ব্যাটারিচালিত যান চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমানে এসব যান পুনঃনিবন্ধনের আওতায় রয়েছে। অনুমোদনের বাহিরে থাকা যানবাহনের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি অটোরিকশা ও ইজিবাইক সীমিত পর্যায়ে আনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply