খবর বরিশাল ডেস্ক : বরিশালের উজিরপুরের সাতলা-হারতার বিস্তীর্ণ বিল ছেয়ে গেছে লাল, সাদা আর নীল শাপলায়। ভোরের আলো ফুটতেই শাপলা রাজ্যে লাল শাপলার অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। ছোট নৌকায় চড়ে বিলের বুক ঘুরে দেখছেন শাপলার সৌন্দর্য, তুলছেন ছবি। তবে অতিরিক্ত নৌকা ভাড়া আদায়, নির্দিষ্ট হারের অভাব এবং পর্যাপ্ত পর্যটন বান্ধব সুযোগ-সুবিধার অভাবে নারী ও শিশুরা বেশ বিপাকে পড়ছেন।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই সাতলার শাপলার বিলে দর্শনার্থীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সাথে আবার কেউ দলবদ্ধভাবে নৌকায় চড়ে বিলের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখছেন। নৌকার চারপাশে ফুটে থাকা লাল, সাদা ও নীল শাপলার সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে দর্শনার্থীদের ভিড়ও বাড়তে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সাতলার বিলগুলো শাপলায় ভরে ওঠে। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল হলেই সাতলা এলাকায় পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। সরকারি ছুটির দিনে ভিড় আরো বেড়ে যায়। বিলের পানিতে ছোট নৌকা নিয়ে ঘুরে ঘুরে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করছেন তারা।
তবে পর্যটকদের বড় অভিযোগ নৌকা ভাড়া নিয়ে। দর্শনার্থীদের দাবি, এক ঘণ্টার জন্য নৌকা ভাড়া নেয়া হচ্ছে প্রায় দুই হাজার টাকা। এতে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা অনেকেই বাড়তি খরচের কারণে বিপাকে পড়ছেন। নৌকা ভাড়া নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক হার নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
শাপলার সৌন্দর্য দেখতে আসা ব্যবসায়ী মিঠু হাওলাদার বলেন, ‘লাল নীল আর সাদা শাপলায় পুরো এলাকা নয়নাভিরাম হয়ে উঠেছে। কিন্তু এক ঘণ্টার জন্য দুই হাজার টাকা নৌকা ভাড়া নেয়ায় আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।’
দর্শনার্থী দুলাল মৃধা বলেন, ‘বরিশালে এত সুন্দর শাপলার বিল আছে, এখানে না এলে তা বুঝতে পারতাম না। নৌকা ভাড়া কমানো হলে আরো বেশি মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।’
পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা আনিকা ইসলাম বলেন, ‘শাপলার অসাধারণ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি। চারদিকে শাপলা আর শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে খুব ভালো লেগেছে।’
শুধু নৌকা ভাড়াই নয়, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে আসা পরিবারগুলোকে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। পাশাপাশি মানসম্মত খাবার ও থাকার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়।
ব্যবসায়ী কামাল তালুকদার বলেন, ‘শাপলার বিল দেখতে এসে খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু পরিবারের নারীদের নিয়ে এসে ওয়াশরুম, টয়লেট বা বাথরুমের ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়েছে।’
দর্শনার্থী ব্যাংকার শারমিন জাহান বলেন, ‘শাপলার বিলকে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হতে পারে।’
বরিশাল শহর থেকে সড়কপথে প্রায় ৬০ থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরের সাতলা বিল বর্ষা মৌসুমে প্রকৃতির অনন্য রূপ ধারণ করে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিলজুড়ে শাপলা ফুটে ওঠে। ভোরের দিকে ফুলগুলো পূর্ণ প্রস্ফুটিত থাকে; বেলা বাড়ার সাথে সাথে অনেক শাপলা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভোরেই পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়।
স্থানীয়দের মতে, পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় সাতলা এলাকায় স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগও তৈরি হয়েছে। কেউ নৌকা চালাচ্ছেন, কেউ খাবার ও বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করছেন। পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে এই সুযোগ আরো বাড়বে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আলী সুজা বলেন, ‘সাতলা-হারতার শাপলার বিল পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। শাপলার বিলকে আরো আকর্ষণীয় ও পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তুলতে সাতলা লাল শাপলা পর্যটনকেন্দ্রে উন্নয়নমূলক কাজ শেষ হয়েছে। এতে ইতিবাচক সাড়াও পাওয়া গেছে।’
নৌকা ভাড়া নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই নৌকা ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হবে।’
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগাতে হলে শুধু সৌন্দর্যনির্ভর পর্যটন নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। নৌকা ভাড়ার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ নৌযান, পর্যাপ্ত টয়লেট ও ওয়াশরুম, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সাতলা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply