খবর বরিশাল ডেস্ক : দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা-ঐতিহ্যের কথা উঠলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় বরিশাল জিলা স্কুলের নাম। প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, বরং বরিশালের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক। অসংখ্য মেধাবী ও কৃতী মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হিসেবে বেড়ে উঠেছেন, যাদের অনেকে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিচার বিভাগ ও সামরিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
১৮২৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর তৎকালীন বরিশালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এন. ডব্লিউ. গ্যারেটের উদ্যোগে মাত্র আটজন শিক্ষার্থী নিয়ে বরিশাল ইংলিশ স্কুল নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৮৫৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বরিশাল জিলা স্কুল। দীর্ঘ এই পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলন ও পরিবর্তনেরও সাক্ষী হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসকে আরও গৌরবময় করেছে।
বরিশাল জিলা স্কুলের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কৃতী প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস, সুরকার আলতাফ মাহমুদ, দার্শনিক সর্দার ফজলুল করিম, কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ, অভিনেতা গোলাম মুস্তাফাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বহু ব্যক্তির স্মৃতি ও সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই বিদ্যালয়ের নাম। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছেই জিলা স্কুলের কঠোর শৃঙ্খলা, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং টিফিনের সময়ের ছোট ছোট দুষ্টুমির স্মৃতি আজও শৈশবের অন্যতম মূল্যবান অধ্যায়।
বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন, প্রশস্ত বারান্দা, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও বিশাল খেলার মাঠ এখনো বহন করছে অতীতের নানা স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কম্পিউটার ল্যাব ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম। তবে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও প্রায় ৪৫ জন শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বরিশাল জিলা স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বরিশালের অসংখ্য পরিবারের আস্থার জায়গা হয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি এখনো শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখায়, এগিয়ে যেতে শেখায় এবং সমাজ ও দেশের জন্য দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার অনুপ্রেরণা দেয়।
১৮২৯ সালে মাত্র আটজন শিক্ষার্থী নিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, প্রায় দুই শতাব্দী পরও তার আলো ছড়িয়ে পড়ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সময় বদলেছে, শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে আধুনিকতা, কিন্তু বরিশাল জিলা স্কুলের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও মর্যাদা আজও অমলিন। তাই বরিশাল জিলা স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা-ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply