আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত একটি উক্তি হচ্ছে “ ও কারা কোরাণ বেদ বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি ও মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! – মুর্খরা সব শোন মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনও ”।
এই উক্তিটির ধর্ম বিচারে কিংবা কাজী নজরুল আস্তিক নাকি নাস্তিক সে আলোচনায় আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমার আগ্রহের জায়গা হচ্ছে উক্তিটির অন্তর্নিহিত বিশালতায় যেখানে কবি অন্ধ ধর্ম বিশ্বাসের দরুন মানুষে মানুষে হানাহানির বিরুদ্ধে গিয়ে অসাম্প্রদায়িকতা ও পরমত সহিষ্ণুতার প্রশান্তিতে সবার হৃদয়ে শান্তির প্রচলন ঘটাতে চেয়েছেন। বর্তমানের যে বর্বর উগ্রবাদী অসহিষ্ণুতা সারা বিশ্বব্যাপী লক্ষ করা যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কবি নজরুলের এই উক্তিটি হতে পারে সাম্প্রদায়িক বন্ধনের অমিয় বাণী। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে নিষ্ঠুর হামলাযজ্ঞে পুরো পৃথিবী যখন হতবাক সেই রেশ কাটতে না কাটতেই শ্রীলঙ্কার গির্জায় বোমা হামলা আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে সন্ত্রাসের কোন ধর্ম নেই, সন্ত্রাসীর নেই কোনো আত্নীয়।
যেকোনো ধর্মের যে কেউ আজ এসব উগ্রবাদীদের সন্ত্রাসের শিকার হতে পারে। কোনো ধর্ম যেমন নরহত্যাকে প্রশ্রয় দেয় না তেমনি কোনো পারিবারিক স্নেহ মমতা শাসন কাউকে সন্ত্রাসী হতে উদ্ভুদ্ধ করতে পারে না। বছরের পর বছর ধরে দখলদারি ইসরায়েল নিষ্ঠুর সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর, একই ধর্মের ছায়াতলে থেকেও সৌদি পার্শ্ববর্তী ইয়েমেনের ওপর বর্বরোচিত অবরোধ আর হামলা চালায়, জাতীয়তাবাদের নির্মম দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ভারতে হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মায়ানমারের সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আজ জন্মভূমি ছাড়া! এগুলো সবই বিভিন্ন অপগোষ্ঠীর ক্ষমতা লোভ আর বৈশ্বিক অস্ত্রব্যাবসার রমরমা অবস্থা টিকিয়ে রাখা ছাড়া আর কিচ্ছু নয়।
অস্ত্র ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত বিশ্বের হর্তাকর্তারা আজ বিশ্বব্যাপী সকল ধর্ম, গোষ্ঠী এবং জনপদ গুলোর বিভক্তিকে বাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি ফায়দা লুটছে।সারা বিশ্বব্যাপী আজ যে মারণাস্ত্রের রমরমা প্রতিযোগীতামূলক বাণিজ্য সেটা রোধ করা না গেলে কখনোই এসব নির্মমতার হাত থেকে আমরা রক্ষা পাবো না। সাথে সাথে বর্তমানে প্রচলিত জনপ্রিয় ধর্মগুলোর সর্বোচ্চ নেতারা যদি একই প্লাটফর্ম থেকে বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং দখলদারত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠতে পারে তবেই কেবল এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব।
পরিশেষে দার্শনিক হুমায়ুন আজাদের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই, ” শয়তানই আজকাল আল্লা আর ঈশ্বরের নাম নিচ্ছে প্রাণ ভ’রে। আদিম শয়তান আর যাই হোক রাজনীতিবিদ ছিলো না, কিন্তু শয়তান এখন রাজনীতি শিখেছে; আল্লা আর ঈশ্বর আর জেসাসের নামে দিনরাত শ্লোগান দিচ্ছে।
”লেখক : শফিক মুন্সি, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র আন্দোলন কর্মী।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply