নগরীর অধিকাংশ পুকুর ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পরেছে। এরমধ্যে কোনটা আর্বজনার ভাগারে পরিনত হয়েছে। আবার কোনটা প্রভাবশালীরা ভরাট করার পায়তারা চালাচ্ছে। যদিও কয়েক বছর আগে এসব পুকুর নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতো। কোন কোনটা ফায়ার সার্ভিসের রিজার্ভ ট্যাংক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। নগরীর প্রায় ১৫ শ’ পুকুরের অধিকাংশই ব্যবহারে অনুপযোগী হওয়ায় এগুলো রক্ষাণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন।
সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা নন্দিতা বসু জানান, ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এক সার্ভেতে দেখা গেছে নগরীতে ১৫ হাজার পুকুর রয়েছে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে তা পরিবর্তিত হয়ে ১০ হাজার পুকুর পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে গুগল ম্যাপের মাধ্যমে নগরীতে ১৫ শ’ পুকুরের ম্যাপ পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় নগরীর পুকুর সংরক্ষণের জন্য ওয়াটার বডি ম্যানেজমেন্ট টুল তৈরি করা হয়েছে। ম্যানেজমেন্ট টুলের মাধ্যমে নগরীর ১৫ শ’ পুকুরই নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছে।
বরিশাল নদী খাল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু জানান, নগরীর কোন পুকুরই সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহার উপযোগী নয়। অধিকাংশই নানা কারণে ভরাট ও আকৃতি হারাচ্ছে। উদাহারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিবির পুকুরে মাছ চাষ করছে সিটি কর্পোরেশন। থানা পুকুর ব্যবহারে চারটি ঘাট ছিল। সেগুলো দখল করে এখন ভাগারে পরিনত করা হয়েছে। দুই একর জমির ওপর রাখালবাবুর পুকুরটির একাংশ ভরাট হয়ে গেছে। ঝাউতলা, গোরস্থান রোড, কালুশাহ সড়ক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনের পুকুর ভরাট করার পায়তারা চলছে। বিলিনের পথে পুলিশ ক্লাব পুকুর ও ত্রিশ গোডাউন দিঘি। তিনি বলেন, এসব পুকুর সিটি কর্পোরেশন শুধু সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য্যবধর্ন করলেই হবে না, জনগনের জন্য ব্যবহারে উপযোগী না করতে হবে।
নগরীর প্রানকেন্দ্র ১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোঃ আক্তারুজ্জামান গাজী হিরু বলেন, গত কয়েকদিন পূর্বে সিটি কর্পোরেশনের সভায় তিনি নগরীর বিবির পুকুর, রাখালবাবুর পুকুর, থানার পুকুর সংস্কারের জন্য মেয়রের কাছে দাবী করেছেন। মেয়র আহসান হাবিব কামালও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, নগরীতে অনেক ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরও রয়েছে। রাতের আধাঁরে নগরীর বিভিন্ন পুকুর ভরাট, দখল ও দুষণ হয়ে যাচ্ছে। বিবির পুকুরের পানি ব্যবহার উপযোগী রাখার চেস্টা করা হলেও সাধারণ মানুষ নানাভাবে পানি দুষণ করছে। কাউন্সিলর হিরু দাবী করেন, নগরীতে ব্যবহার উপযোগী একমাত্র পুকুর হচ্ছে অক্সফোর্ড মিশন স্কুলের পুকুরটি।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর বরিশাল আঞ্চলিক অফিসের সিনিয়র পরিকল্পনাবিদ মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, মাস্টার প্লানে বরিশালের পুকুরগুলোকে ম্যাপের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য পুকুরকে ব্যবহার উপযোগী ও সংরক্ষণ করার কথা মাস্টার প্লানে বলা হয়েছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নিচ্ছেনা। ফলে বরিশালে অপরিকল্পিত নগরায়নের সৃষ্টি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর কাঠপট্টি এলাকার কোতোয়ালী মডেল থানার শতাধিক বছরের পুকুরটি ময়লা আবর্জনা ও কচুরিপানায় ভরে যাওয়ার কারণে ব্যবহারে সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পরেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ওই পুকুরের পানি ব্যবহার করায় স্থানীয়দের মাঝে চর্ম ও পানিবাহিত রোগ দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে পুকুরটি রক্ষা করাসহ ব্যবহার উপযোগী করার জন্য এলাকাবাসী সিটি মেয়র আহসান হাবীব কামালের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেছেন। স্থানীয়রা জানান, নগরীর কাটপট্টি এলাকার ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের নারী-পুরুষসহ কয়ক শ’ সংখালঘু পরিবারের সদস্যরা বছরের পর বছর ধরে ওই পুকুরের পানি ব্যবহার করে আসছিল। বেশ কয়েক বছর পূর্বে পুকুরটি সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোতোয়ালী মডেল থানার হেফাজতে যাওয়ার পর থেকেই শত বছরের পুরনো পুকুরটি অভিভাবকহীন হয়ে পরে। বর্তমানে পুকুরটিতে কচুরিপানায় ভরে গেছে। একই সাথে পুকুরের চারিপাশের ময়লা আবর্জনায় মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশালের সহকারী পরিচালক এইচএম রাশেদ বলেন, নগরীর পুকুরগুলো রক্ষায় তারা ইতোমধ্যে বিভিন্নস্থানে পুকুর ভড়াটকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করেছেন। এসব পুকুরের পানির মান পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে দূষণমুক্ত করার জন্য সুপারিশও করা হয়েছে। তবে পুকুর রক্ষাণাবেক্ষণ কিংবা দুষণমুক্ত করার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের নয়।
এ ব্যাপারে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান জানান, রক্ষনাবেক্ষণ, পুকুর নিয়ে মালিকানা বিরোধ, অবৈধ দখল, দুষণ, পুকুরে পানি কম থাকা, সরকারী দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে দিনে দিনে পুকুরগুলো ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পরেছে। ব্যক্তি মালিকানার পুকুরগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে জলাবদ্ধতা, পরিবেশের ভারসম্য বিপর্যয় ও কোথাও আগুন লাগলে পুকুর না থাকায় পানি পাওয়া যাচ্ছেনা। আবার অনেক পুকুরের সাথে ড্রেনেজ লাইন থাকার কারণে পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পরেছে। তিনি আরও জানান, এ অবস্থায় সার্ভে করে নগরীর বিবির পুকুর, টিবির পুকুর, রাখালবাবুর পুকুর, আমতলার মোড়, থানার পুকুর, চৌমাথা পুকুরের পানি ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply