এইচ আর হীরাঃ
বাংলাদেশে শীতের শুরুতেই খেজুরের রস সংগ্রহের উৎসবের একটা আলাদা আমেজ ছিল। গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে তৈরি হত পাটালি গুড়, খেজুরের রসের মিষ্টি, এবং বিভিন্ন রকমের ঐতিহ্যবাহী খাবার। কিন্তু, বর্তমানে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে খেজুর গাছের সংখ্যা কমছে এবং সেই সঙ্গে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রক্রিয়া বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একারণেই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রেহের আগ্রহ কমছে গাছীদের।
ইটপাথরের শহরে এখনও তেমন শীত অনুভব না হলেও গ্রামাঞ্চলে কুয়াশায় মোড়া শীতের সকালের জানান দিচ্ছে। আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহে এই সময়টা ব্যস্ত থাকার কথা গাছিদের। কিন্তু বরিশালে সেটা এখন আর তেমন চোখে পড়েনা। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নেই জেলা এবং উপজেলার প্রতিটি গ্রামেই। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ এবং খেজুরের রস দিয়ে তৈরি শীতের পিঠা। এক সময় খেজুর রসের মনমাতানো গন্ধে মৌ, মৌ করতো বরিশালের গ্রাম অঞ্চলের পথঘাট অলি গলি এবং রস থেকে গুড় তৈরি করে তা বাজারে বিক্রি করতেন গাছিরা, কিন্তু এখন তাও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। বিসিসি’র ৩ নম্বর ওয়ার্ডে হঠাৎ চলার পথে দেখা গেল একটি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্যস্ত ৩৫ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রতি বছরের ন্যায় তিনি এবছরও নিজের ও অন্যেরসহ মোট ৪০-৫০টি গাছ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করবেন।
ইতিমধ্যে প্রায় ২০টি প্রস্তুত করেছেন। গাছ ছেঁচে থেকে রস সংগ্রহ পর্যন্ত এখনো ১০থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। বিশেষ কৌশলে বাঁশের তৈরি খিল- চুঙ্গি বসানোর পর মাটির হাড়ি পেতে সুস্বাদু এ রস সংগ্রহ করা হয়। গাছ থেকে রস বের করতে প্রতিদিন গাছের কিছু অংশ ছেঁচে ফেলা হয়। একাধারে ৩ দিন কান্ড শুকানোর পর পুনরায় পালাক্রমে রস সংগ্রহ করা হয়। তিনি আরো জানান, গড়ে প্রতিটি গাছ থেকে ৩লিটার রস পাওয়ার আশা করছেন, বর্তমানে খেজুর রসের চাহিদা অনেক বেশি।
দরদাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৫ লিটারের প্রতি কলস সাড়ে ৪ থেকে ৫’শ টাকায় এবং প্রতি কেজি গুড় ১৪০-১৫০টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি কাঠ ও কয়লা অপেক্ষা খেজুর গাছ সস্তা দামে পাওয়া যায় বলে ইট ভাটায় এর চাহিদা বেশি। সেজন্যই খেজুরের গাছ কেটে ইট ভাটায় বিক্রি করা হয়। কেননা, খেজুরের গাছে পোড়ানো ইটের রং গাঢ় হয়। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় গ্রামগুলোর মেঠোপথের ধারে কোথাও কোথাও দু’একটি খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। গ্রামগুলোতে জীব বৈচিত্র্যের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উন্নয়নে বন বিভাগের সচেতনতার অভাবে এসব অঞ্চলে খেজুর গাছ অনেকটা বিলুপ্তির পথে।
এক সময় খেজুর গাছের রস ও তার গুড়ের খ্যাতি থাকলেও হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার সেই পুরনো ঐতিহ্য। সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের জব্বার হোসেন বলেন, চাহিদা মত খেজুর গাছ না পাওয়ার কারণে রস কম হওয়ায় আশানুরূপ গুড় তৈরি করতে পারিনি। তাই পূর্বের পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবন-জীবিকার জন্য শীতের মৌসুমে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হব। তবে যেভাবে খেজুর গাছ কাটা হচ্ছে অল্প দিনের মধ্যেই এই এলাকায় খেজুরের রস ও গুড় ইতিহাস হয়ে থাকবে।
এ ব্যাপারে বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃৃষি কর্মকর্তা গাজী জালাল উদ্দীন জানান, বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই খেজুর গাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। গাছিদের খেজুর গাছ কাটার কাজটি শিল্প আর দক্ষতায় ভরা। ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে রয়েছে কৌশল, রয়েছে ধৈর্য ও অপেক্ষার পালা। এ জন্য মৌসুমে আসার সাথে সাথে দক্ষ গাছিদের কদর বাড়ে। তবে আমাদের অসচেতনতার কারণে খেজুর গাছ এখন বিলুপ্তির পথে।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply