খবর বরিশাল ডেস্ক : আওয়ামী লীগ আমলে বরিশালের সবচেয়ে প্রতাপশালী নেতা ছিলেন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। সে সময়ে তার প্রাসাদসম ‘সেরনিয়াবাত ভবন’ থেকেই পুরো দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের আওয়ামী রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হতো। রাজার বাড়ি না হলেও স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এই রাজবাড়ির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করত দলটির নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। চাইলেই সেখানে প্রবেশ করা যেত না। ওই বাড়ির বাসিন্দাদের সাক্ষাৎ পেতে লেগে যেত সপ্তাহ-মাস। অথচ দুই বছরের ব্যবধানে এই বাড়িতে এখন সন্ধ্যাবাতি জ্বালানোরও মানুষ নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণরোষের শিকার আলোচিত বাড়িটিতে হামলার পর অগ্নিসংযোগ আর এক্সকেভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ভগ্ন ও বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে নগরীর কালীবাড়ি রোডের এই বাড়িটি। ভেঙে পড়া দেওয়ালে জন্মেছে পরগাছা। ছেয়ে গেছে শ্যাওলা আর নানা পরজীবী উদ্ভিদে। একসময়ের ক্ষমতার প্রাসাদ এখন শিয়াল-কুকুরের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, ষাটের দশকে এখানে একটি টিন-কাঠ আর গোলপাতার ঘর ছিল। সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসস্থান ছিল এটি। এর সামনে ছিল গোলপাতার ছাউনির ছোট্ট চেম্বার। সেখানে আইন পেশার কাজ করতেন তিনি। ১৯৭৩ সালে বরিশাল পৌরসভার নির্বাচনে জেতেন রব সেরনিয়াবাতের বড় ছেলে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। পৌর চেয়ারম্যান হওয়ার পর সেখানে ছোটখাটো প্রাসাদসম দোতলা বাড়ি করেন তিনি। এটিই পরে পরিচিতি পায় সেরনিয়াবাত ভবন হিসাবে। ১৫ আগস্ট রব সেরনিয়াবাতের মৃত্যুর পর বরিশাল আওয়ামী লীগের দায়িত্ব পরে হাসানাতের কাঁধে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেন ভিন্ন এক হাসানাত।
১৯৯৬ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সংসদের চিফ হুইপ করা হয় হাসানাতকে। এরপর এই ভবন ঘিরে ভূমি দখল, নির্যাতনসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ আসতে থাকে। সেখানে টর্চার সেল থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারতে পালিয়ে যান হাসানাত। ওয়ান ইলেভেনের সময়ও তিনি ভারতে পালিয়ে যান। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর প্রথমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং পরে পার্বত্য শান্তিচুক্তিবিষয়ক কমিটির সভাপতি করা হয় তাকে। ফের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। এর মধ্যে রাজনীতিতে নাম লেখান তার বড় ছেলে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়রের পাশাপাশি তিনি হন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বাবার পরে ছেলের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সেরনিয়াবাত ভবন। কার্যালয়ের পরিবর্তে এই ভবনে সব কার্যক্রম চালাতেন তিনি। নগর ভবনে না যাওয়া সাদিক পুরো সিটি করপোরেশনকেই যেন তুলে আনেন এই ভবনে!
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা যুগান্তরকে বলেন, এই সেরনিয়াবাত ভবনে কবর হয়েছে প্রতিশ্রুতিশীল বহু রাজনৈতিক নেতার ভবিষ্যৎ। যারা প্রভুভক্ত ছিলেন, কেবল তাদেরই ভাগ্য খুলেছে। এখানে বেচাবিক্রি হতো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পর্যন্ত। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর বলেন, ‘টর্চার সেল হিসাবেও ব্যবহার হতো এই বাড়ি। আওয়ামী আমলে এখানে মারধরের শিকার হয়েছেন একাধিক কাউন্সিলর। একবার সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তাকে বেধড়ক মারধর করা হয় এই ভবনে। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় পাশের একটি ক্লাবে রেখে কয়েক দিন চিকিৎসা দেওয়ার পর সুস্থ হলে যেতে দেওয়া হয় বাড়ি।
সাবেক এক উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, পুরো পরিবারটি চলত রাজকীয় স্টাইলে। চাইলেই হাসানাত বা সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে দেখা করা যেত না। কেবল তারা চাইলেই মিলত দেখা। ৫ আগস্ট সরকার পতনের দুদিন আগে ছেলে আশিক আর মেয়ে কান্তা আব্দুল্লাহকে নিয়ে ভারতে পালান হাসানাত। শেখ হাসিনার পলায়নের পরও সেরনিয়াবাত ভবনেই ছিলেন সাদিক আব্দুল্লাহ। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ও সন্তানরা। বিকাল ৪টা নাগাদ কয়েক হাজার মানুষ হামলা চালায় সেরনিয়াবাত ভবনে। প্রথমে ঠেকানোর চেষ্টা করলেও পরে তারা পালিয়ে যান। ভাঙচুরের পর ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন। এর কয়েক দিন পর এক্সকেভেটর দিয়ে অনেকটা মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া ভবনটি। শুক্রবার কালীবাড়ি রোডের এই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের দেওয়ালজুড়ে জন্মেছে নানা আগাছা। শ্যাওলা জমেছে পুরো বাড়িতে। কুকুর বিড়ালও আস্তানা করেছে। আশপাশের বাসিন্দারা বলেন, ‘এটা এখন তাদের (কুকুর) স্থায়ী নিবাস। রাতে শিয়ালও আসে।’ বরিশাল নগরে আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেন আমু, জাহাঙ্গীর কবির নানক, জাহিদ ফারুক শামিমসহ আরও অনেক নেতার বাড়ি থাকলেও সেরনিয়াবাত ভবনের মতো এত ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি কোনোটি। অন্য নেতাদের বাড়ি দেখভালের লোক থাকলেও সেরনিয়াবাত ভবনের আগাছা পরিষ্কার করার মতো লোকও যেন নেই। আলিশান ভবন থেকে ক্রমেই এটি জঙ্গলে রূপ নিচ্ছে।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply