শনিবার, ২২শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৪:০০

তফসিলের আগেই বরিশাল সিটিতে আগাম ভোটের আবহ

dynamic-sidebar

খবর বরিশাল ডেস্ক : বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ঘণ্টা বাজেনি। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, নির্ধারিত হয়নি ভোটের দিন-তারিখও। কিন্তু তার আগেই মেয়র পদকে কেন্দ্র করে বরিশালের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে আগাম উত্তাপ। কে পাবেন দলীয় মনোনয়ন, কার নেতৃত্বে ভোটের মাঠে নামবে দল, আর শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীর পক্ষে যাবে নগরবাসীর সমর্থন, এসব প্রশ্নে সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন।

তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনসংযোগ, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক তৎপরতা চোখে পড়ছে। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরে মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। দলটির কেন্দ্রীয়, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকায় মনোনয়ন দৌড়ও বেশ জমে উঠেছে।

তবে বিএনপির পাশাপাশি পিছিয়ে নেই অন্যান্য রাজনৈতিক দলও। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বামপন্থী দলগুলোও সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। ফলে তফসিল এখনো ঘোষণা না হলেও বরিশাল নগরীতে কার্যত শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনের প্রাক-প্রস্তুতি।

মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন। নগরীর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলছেন, এখন পর্যন্ত মেয়র পদে দল কাউকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়নি। ফলে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতাও থেমে নেই।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের আলোচনায় রয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়দুল হক চাঁন, আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবির এবং মহানগর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন। এ ছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে।

দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন জানিয়েছেন, সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই। তিনি নিজেও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন।

আবুল কালাম শাহীন বলেন, ছাত্রদল দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাধারণ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে। দলীয় মনোনয়ন না পেলে কষ্ট থাকবে, তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই প্রার্থী বাছাই করা উচিত। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাঁদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করবেন। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে তিনি কখনো যাননি, এবারও যাবেন না।

এদিকে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারও নগরীতে নিয়মিত জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, দলের চেয়ারপারসনের নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কাজ করছেন। সাধারণ মানুষ ও দলের হাইকমান্ড চাইলে তিনি মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী। তবে প্রার্থী বাছাইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হাইকমান্ডের।

বিএনপির পাশাপাশি বরিশাল সিটি নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মাঠে সক্রিয় হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলালের নাম সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমির জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হবে। এখনো কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে স্থানীয়ভাবে অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলালকে সামনে রেখে কাজ করা হচ্ছে।

বরিশাল সিটি নির্বাচনে এবারও এককভাবে লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গত নির্বাচনে দলটির প্রার্থী ছিলেন সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তবে এবার তিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী নন বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন। ফলে নতুন প্রার্থীকে ঘিরে দলটির ভেতরে আলোচনা চলছে।

বরিশাল মহানগর ইসলামী আন্দোলনের সহকারী সেক্রেটারি নাসির উদ্দিন নাইস বলেন, মেয়র পদে তাঁরা এককভাবে নির্বাচন করবেন। তবে প্রার্থী চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত দেবেন দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।

দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে আইনজীবী শেখ আব্দুল্লাহ নাসিরের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

শেখ আব্দুল্লাহ নাসির বলেন, নির্বাচনের দিন-তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। তিনি দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছেন। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বরিশাল সিটি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বরিশাল জেলার প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাঈদ মুসা বলেন, এখন পর্যন্ত দলের কোনো প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই প্রার্থী ঘোষণা হতে পারে। জোটের বিষয়ে নির্বাচনের ঘোষণা আসার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বামপন্থী দলগুলোও সিটি নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাসদ বরিশাল জেলার সমন্বয়ক ডা. মনিষা চক্রবর্তী বলেন, সিটি নির্বাচনে বামপন্থীদের প্রার্থী থাকবে। তবে ভোটের দিন-তারিখ নির্ধারিত না হওয়ায় এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। দল ও জোটের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি নির্বাচন করবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজনের নাম নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে। তবে সংশ্লিষ্টদের কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি বুঝে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তফসিল ঘোষণার আগের এই তৎপরতা মূলত মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইকে কেন্দ্র করেই। বিশেষ করে বিএনপির মতো বড় দলের একাধিক হেভিওয়েট নেতা মেয়র পদে আগ্রহী হওয়ায় দলীয় মনোনয়ন ঘিরে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিএনপির ধানের শীষ কার হাতে ওঠে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন কাকে সামনে আনে, এনসিপি ও বামপন্থীরা কোন কৌশলে মাঠে নামে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কতটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন, এসবের ওপরই বরিশাল সিটি নির্বাচনের চূড়ান্ত সমীকরণ অনেকাংশে নির্ভর করবে।

প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটি করপোরেশনে রয়েছে ৩০টি ওয়ার্ড ও ২২৫টি মহল্লা। এখানে ৩০ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং ১০ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

২০০৩ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন মজিবর রহমান সরোয়ার। এরপর প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন, প্রয়াত আহসান হাবীব কামাল, সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এবং সর্বশেষ আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন।

এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি। কিন্তু মেয়র পদ ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে বরিশালের রাজনৈতিক মাঠ ইতোমধ্যেই উত্তপ্ত। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, এই আগাম তৎপরতা যে আরও প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেবে, এমনটাই মনে করছেন নগরীর রাজনৈতিক মহল।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All Rights reserved © 2018 KhoborBarisal.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net