বৃহস্পতিবার, ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:৩৩

শিরোনাম :
৫০০ শয্যার প্রশাসনিক অনুমোদন মিললেও পূর্ণাঙ্গ সেবা এখনও অধরা

৫০০ শয্যার প্রশাসনিক অনুমোদন মিললেও পূর্ণাঙ্গ সেবা এখনও অধরা

dynamic-sidebar

খবর বরিশাল ডেস্ক :

তিন বছরের শিশু রাফির জ্বর, ঠান্ডা-কাশির সঙ্গে শুরু হয়েছিল পাতলা পায়খানা। বরগুনার আমতলীর মহিষকাটা গ্রামের বাসিন্দা বাবা রুহুল আমিন ভেবেছিলেন, স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ (পমেক) হাসপাতালে নিলে হয়তো ছেলের উন্নত চিকিৎসা মিলবে। 

গত সোমবার সকালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে পটুয়াখালী হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েন রুহুল আমিন। হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় ছেলেকে কাঙ্খিত চিকিৎসা দিতে শেষ পর্যন্ত বরিশালের পথে রওনা হন তিনি।

রুহুল আমিনের মতো দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসার আশায় প্রতিদিন যে বিপুলসংখ্যক মানুষ পটুয়াখালীর এই হাসপাতালে আসেন, তাদের অনেকের জন্য এমন পরিস্থিতি নতুন নয়।

 

হাসপাতালের নামের সঙ্গে ‘২৫০ শয্যা’ যুক্ত হলেও বাস্তবে এখানে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা নির্ধারিত শয্যার কয়েক গুণ। অথচ সেই বিপুল রোগীর চাপ সামলানোর মতো চিকিৎসক নেই। ৭৭টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ৫১টিই শূন্য। মাত্র ২৬ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে ২৫০ শয্যার এই হাসপাতাল। শয্যা বেড়েছে, রোগীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ, হাসপাতালের অবকাঠামোও বেড়েছে, কিন্তু চিকিৎসকের সংকট কাটেনি।

সোমবার হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। নারী ও শিশুর সংখ্যাইবেশি।

হাসপাতালের নির্ধারিত শয্যা ২৫০টি হলেও ওই দিন হাসপাতালে মোট রোগী ছিলেন ৮২৪ জন।

হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগের ভর্তি রোগী ছিলেন ৭৮১ জন। ওই দিন নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২২৯ জন। ছাড়পত্র পেয়েছেন ১০২ জন এবং স্বেচ্ছায় হাসপাতাল ছেড়েছেন ৭৭ জন। ছয়জন রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। ওই দিন একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা ছিল তিন গুণেরও বেশি।

এই চাপ শুধু একটি দিনের চিত্র নয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট, প্রথম আট মাসে হাসপাতালের আন্তবিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৯ হাজার ১৫০ জন।

একই সময়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪১ হাজার ৭২ জন এবং বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭৮ হাজার ৯০৩ জন। সব মিলিয়ে আট মাসে তিন বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার রোগী। এত বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ২৬ জন।

২৫০ শয্যার হাসপাতালের অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়কসহ ৭৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু কর্মরত মাত্র ২৬ জন। সবচেয়ে বড় সংকট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে।

১০টি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র একজন, গাইনি বিভাগের চিকিৎসক। অন্যদিকে সার্জারি, শিশু, মেডিসিন, নাক-কান-গলা, অ্যানেসথেশিয়া, চক্ষু, চর্ম ও যৌন, কার্ডিওলজি এবং অর্থোপেডিক বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্টের নয়টি পদই শূন্য। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন চারজন। তারা অর্থোপেডিক, অ্যানেসথেশিয়া, শিশু ও মেডিসিন বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি আটটি পদ, গাইনি, চক্ষু, কার্ডিওলজি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, প্যাথলজি, চর্ম ও যৌন, সার্জারি এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন ও পুনর্বাসন পদশূন্য। এ ছাড়া আবাসিক ফিজিশিয়ান, আবাসিক সার্জন ও আবাসিক মেডিকেল অফিসারের পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। সহকারী সার্জনের ১৬টি পদের মধ্যে ১৫টিই খালি। তিনটি অ্যানেসথেটিক পদের একটিতেও চিকিৎসক নেই। রেডিওলজিস্ট কর্মরত থাকলেও প্যাথলজিস্টের পদ শূন্য। ১০টি আবাসিক মেডিকেল অফিসারের মধ্যে পাঁচটি, ১১টি সহকারী রেজিস্ট্রারের মধ্যে তিনটি এবং আটটি ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের মধ্যে চারটি পদও শূন্য। ডেন্টাল সার্জনের পদটিও পূরণ হয়নি। অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক নেই, তবু আট মাসে ৬৭৫ সিজার।  হাসপাতালের গাইনি বিভাগে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট থাকায় গর্ভবতী নারীদের চাপ রয়েছে। কিন্তু সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় প্রশ্ন উঠছে, এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে অস্ত্রোপচার চলছে?

হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে এখানে ৬৭৫টি সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ (পমেক) হাসপাতালের শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে এসব অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা পমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এস এম কবির হাসান বলেন, গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও অ্যানেসথেটিক চিকিৎসক নেই।

এই অবস্থায় মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহায়তায় গর্ভবতী মায়েদের সিজার করা হচ্ছে।

শিশু বিভাগেও একইভাবে মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে কর্মরত  একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহায়তায় শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বেও রয়েছে জনবল ঘাটতি। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক পদটি শূন্য থাকায় তত্ত্বাবধায়ককে প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, হাসপাতালের সার্বিক প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনাও সীমিতসংখ্যক চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মশিউর রহমান বলেন, বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও তারা সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।  তবে দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে চিকিৎসক সংকট অনেকটাই কমবে বলে মনে করেন তিনি। চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

৫০ থেকে ২৫০, এরপর ৫০০, কিন্তু অপেক্ষা শেষ হয়নি

পটুয়াখালী শহরের কালিকাপুর এলাকায় হাসপাতালটির যাত্রা শুর হয়েছিল কয়েক দশক আগে। ১৯৭৯ সালে এখানে ১০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৬ সালে এটি ১৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। এরপর ২০০৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শয্যা বাড়ানোর সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চিকিৎসকের পদও সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সেই অনুমোদিত পদগুলোর বড় অংশ এখনও শূন্য। এরই মধ্যে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২০ সালের ২১ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পটুয়াখালীর ২৫০ শয্যার হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়। পরে আলাদা ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পও একনেকে অনুমোদন পায়।

কিন্তু প্রশাসনিক অনুমোদনের ছয় বছর পরও পূর্ণাঙ্গ ৫০০ শয্যার হাসপাতালের সেবা চালু হয়নি। অন্যদিকে রোগীর চাপ থেমে নেই বরং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এই হাসপাতালের ওপর আরও বড় দায়িত্ব তৈরি হয়েছে।

২০১৪ সালে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজটির সঙ্গেই রয়েছে ২৫০ শয্যার পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল। চিকিৎসা শিক্ষার পাশাপাশি আশপাশের জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হাসপাতালটি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা ডা. এস এম কবির হাসান বলেন, হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের সংকট প্রকট। শিশু বিভাগে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহায়তায় চিকিৎসাসেবা চালানো হচ্ছে। গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকলেও অ্যানেসথেটিক চিকিৎসক নেই। তাঁর মতে, হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পাওয়া যাবে এবং মানুষ কাঙ্খিত চিকিৎসাসেবা পাবেন।

কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত পটুয়াখালীর মানুষের অপেক্ষা কত দীর্ঘ হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ হাসপাতালের কাগজে শয্যা ২৫০টি, বাস্তবে রোগী প্রতিদিন তার কয়েক গুণ।

কাগজে চিকিৎসকের পদ ৭৭টি কিন্তু রোগীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন মাত্র ২৬ জন। আর ছয় বছর আগে ৫০০ শয্যার প্রশাসনিক অনুমোদন মিললেও পূর্ণাঙ্গ সেবা এখনও অধরা।

পটুয়াখালীর এই হাসপাতালের গল্প তাই শুধু চিকিৎসক সংকটের নয়; এটি এমন এক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গল্প, যেখানে রোগীর সংখ্যা ও প্রয়োজন বাড়ছে দ্রুত, কিন্তু সেই অনুপাতে চিকিৎসক ও সেবা কাঠামো এগোচ্ছে না।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All Rights reserved © 2018 KhoborBarisal.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net