খবর বরিশাল ডেস্ক ::
বরিশালজুড়ে ভয়াবহ আকার নিচ্ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছরে বিভাগের ছয় জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৯১ জনে। মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় বাড়ছে চাপ। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা তো নেই-ই, সরকারি মশারি থাকলেও তা দেওয়া হচ্ছে না অনেক রোগীকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, রোগীরা মশারি নিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ায় নার্সদের কৈফিয়ত দিতে হয়। সেই ‘চুরির’ ভয়ে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের মশারি দেওয়া হচ্ছে না। আবার কেউ বাড়ি থেকে মশারি নিয়ে এলেও হাসপাতালের শয্যাগুলোয় তা টাঙানোর ব্যবস্থা নেই। ফলে মশারি ছাড়াই ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে অবস্থান করছেন সাধারণ রোগীরা।
এতে একদিকে ডেঙ্গু রোগীরা মশার কামড় থেকে সুরক্ষা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে একই ওয়ার্ডে থাকা অন্যান্য রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভাগের ছয় জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৯১ জন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১০ জন। একই সময়ে মারা গেছেন একজন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে বিভাগে মোট মৃত্যু ১০ জনের।
সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বর রাতে মারা যান বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা উত্তম ঘরামি (৫৩)। মৃতদের মধ্যে আটজন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, একজন ঝালকাঠি এবং একজন পিরোজপুর হাসপাতালে মারা গেছেন।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন ৩৮২ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৬৭ জন রয়েছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৩৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
আক্রান্তের হিসাবে বিভাগের সবচেয়ে এগিয়ে পিরোজপুর ও ঝালকাঠি। পিরোজপুরে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮৩৬ জন এবং ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৬২২ জন। এ ছাড়া বরগুনায় ৯২১, বরিশালে ৭১২, পটুয়াখালীতে ৬৬১ এবং ভোলায় ৩৫৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
এর বাইরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪১৮ জন এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, ছয়টি পৃথক মেডিসিন ওয়ার্ডেই সাধারণ রোগীদের সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগীর শয্যায় নেই মশারি।
হাসপাতাল থেকে মশারি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রোগীরা। কেউ কেউ বাড়ি থেকে মশারি আনলেও তা টাঙানোর মতো কোনো ব্যবস্থা নেই।
নেছারাবাদের বাসিন্দা তহমিনা বেগম ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে কোনো মশারি দেয়নি। বাড়ি থেকে মশারি এনেছিলাম। কিন্তু টাঙানোর ব্যবস্থা না থাকায় বালিশের নিচে রেখে দিয়েছি।
পিরোজপুরের কাঁঠালিয়া থেকে আসা মো. সোহবাহান গাজী বলেন, জ্বর না কমায় উপজেলা হাসপাতালে যাই। সেখান থেকে এখানে পাঠিয়েছে। চিকিৎসকেরা সব সময় মশারি টাঙিয়ে রাখতে বলেছেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো মশারি দেওয়া হয়নি।
মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন বাকেরগঞ্জের লাল মিয়ার অভিযোগ, ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে সাধারণ রোগীদের একই জায়গায় রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগী আর সাধারণ রোগী একসঙ্গে থাকলে তাদের মাধ্যমে আমরাও আক্রান্ত হতে পারি। ডেঙ্গু রোগীরা মশারি টাঙাচ্ছেন না। এভাবে একসঙ্গে থাকলে ভয় লাগে।
মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের রোগী কবিতা বেগম বলেন, তিন দিন ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার পাশেই তিন-চারজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ওয়ার্ডে মশার উপদ্রবও রয়েছে। ফলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন তিনি।
হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকারী নার্সরা অবশ্য বলছেন, রোগীদের মশারি না দেওয়ার কারণ অবহেলা নয়। তাদের দাবি, মশারি দিলেও অনেক রোগী তা ব্যবহার করেন না। পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যান।
নার্সদের ভাষ্য, মশারির হিসাব দিতে হয়। কোনো মশারি পাওয়া না গেলে ওয়ার্ড ইনচার্জ বা সংশ্লিষ্ট নার্সদের কৈফিয়ত দিতে হয়। এ কারণে মশারি বিতরণে অনীহা তৈরি হয়েছে।
তাদের আরও দাবি, শয্যাগুলোর দুই পাশে মশারি টাঙানোর পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। ফলে মশারি থাকলেও সব রোগীকে তা দেওয়া সম্ভব হয় না।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. মাজহারুল রেজওয়ান রেজা বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত মশারি রয়েছে এবং প্রতিটি মেডিসিন ওয়ার্ডেই মশারি দেওয়া হয়েছে। তবে রোগীদের মশারি দেওয়ার ক্ষেত্রে নার্সদের মধ্যে কিছুটা অনীহা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রোগীরা সুস্থ হয়ে মশারি বাড়িতে নিয়ে যান। এটা নিয়ে নার্সদের কৈফিয়ত দিতে হয়।’
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য আলাদা ওয়ার্ড না থাকার বিষয়েও তিনি বলেন, আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ছয়টি মেডিসিন ওয়ার্ডে আলাদা কর্নার করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
তার ভাষ্য, অনেক রোগীকে বেড দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার বেডের সঙ্গে মশারি টাঙানোর স্ট্যান্ড না থাকায় ডেঙ্গু রোগীদের মশারি ব্যবহার করানোও সম্ভব হচ্ছে না। এতে ডেঙ্গু রোগীদের মাধ্যমে অন্য রোগীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply