নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
ঋণ প্রদানে অনিয়ম ও স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগে বেসরকারি খাতের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের (এনআরবিসি) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে শোকজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ২০ মার্চ পাঠানো পৃথক দুটি চিঠি এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ফারাসাত আলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সূত্র জানায়,এনআরবিসির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ১০টি অভিযোগ তোলে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে বলা হয়,ব্যাংক কোম্পানি আইন ও ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আপনি এনআরবিসি ব্যাংকের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ প্রেক্ষিত প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে আপনাকে কেন অপসারণ করা হবে না এ বিষয়ে নোটিস প্রাপ্তির ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হলো। ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ফারাসাত আলীর বিরুদ্ধেও প্রায় একই অভিযোগ করা হয়। ব্যাংকটির যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর আওতায় কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তার কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণ দর্শনো নোটিস পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এনআরবিসির ব্যাংক।
জানা যায়,এনআরবিসি ব্যাংকে পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংকের গভর্ন্যান্স ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ধরা পড়ে। এছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের সঙ্গে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে; যা ব্যাংক কোম্পানি ও আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থী। ব্যাংকের চারজন পরিচালক যথাক্রমে কামরুন্নাহার সাথী, এবিএম আবদুল মান্নান, ফিরোজ হায়দার খান ও মো. আমির হোসেন দেশের বাইরে থাকলেও স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক কর্তৃক তাদের সভায় উপস্থিত দেখানো হয়েছে।
২০১৪ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত ২১তম পর্ষদসভায় পরিচালক কামরুন্নাহার সাথী,এবিএম আবদুল মান্নান, ফিরোজ হায়দার খান ও মো. আমিরসহ ১০ পরিচালকের পক্ষে বিকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বিকল্প পরিচালক নিয়োগ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন করা হয়নি।
ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়,ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও কামরুন্নাহার সাথী খেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে তাকে ব্যাংকের পর্ষদে নিয়োগ দেওয়া হয়; যা ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ১৫ (৬) (উ) ধারার লঙ্ঘন। একই অভিযোগ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবর রহমানের বিরুদ্ধে।
চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে আরও বলা হয়, ব্যাংকের পরিচালক কামরুন নাহার সাথী ও এবিএম আবদুল মান্নানের বিকল্প পরিচালক যথাক্রমে একেএম শফিকুল ইসলাম এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সৈয়দ গোলাম ফারুক। শফিকুল ইসলাম ও গোলাম ফারুক একাধারে ব্যাংকটির বিকল্প পরিচালক এবং আহসান গ্রুপের পরিচালক ও উপদেষ্টা। ২০১৫ সালের ৬ জুন অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পর্ষদসভায় এ দুই বিকল্প পরিচালকের উপস্থিতিতে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এজি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে ১১৯ কোটি টাকার
ঋণ সুবিধা অনুমোদন করা হয়েছে, যা একাধারে বিআরপিডি সার্কুলার নং ১১/২০১৩-এর ১.৪ (ঙ) ধারায় বর্ণিত নির্দেশনার লঙ্ঘন এবং ব্যাংকিং নিয়মনীতিবহির্ভূত।
ব্যাংকটির গুলশান শাখার গ্রাহক সালাউদ্দিন চৌধুরী,এমএ আজিজ চৌধুরী এবং তারেক চৌধুরীর গৃহনির্মাণে ঋণের আবেদনের সঙ্গে শাখার প্রস্তাবে এম বাই এস স্টাইলিশ গার্মেন্টসের নাম না থাকা সত্ত্বেও পর্ষদ কর্তৃক ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৩৯তম সভায় ওই প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ৩৪ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়,যা ব্যাংকিং নিয়মনীতিবহির্ভূত।
জানা যায়, ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এখন মূল বিনিয়োগকারীদের পরিবর্তে বহিরাগত ও তথাকথিত প্রিমিয়ামের টাকা দিয়ে পরিচালক হওয়া ব্যক্তিদের হাতে চলে গেছে। এঁদের মূল লক্ষ্য, ব্যাংকের আমানতের টাকা বিভিন্ন কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া। অনিয়মে বাধা দেওয়ার মতো যেসব পরিচালক ছিলেন তাঁদের নানা কৌশলে ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকার সর্বশেষ যে নয়টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়, এনআরবিসি ব্যাংক তারই একটি। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল এ ব্যাংকের ইচ্ছাপত্র (এলওআই) দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ফরাসত আলীর নামে। তবে প্রতিষ্ঠাকালে ব্যাংকটিতে ২০ জন পরিচালকের নাম থাকলেও নানা কৌশলে ৫ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন জার্মানপ্রবাসী প্রকৌশলী আবু মোহাম্মদ তুষার ইকবাল রহমান,কানাডায় একটি কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিরোজ হায়দার খান,ফিনল্যান্ডে একটি কোম্পানির সিইও তমাল এস এম পারভেজ,রাশিয়ায় তিনটি কোম্পানির অন্যতম মালিক রফিকুল ইসলাম মিয়া আরজু এবং যুক্তরাজ্যে তিনটি কোম্পানির এমডি মোহাম্মদ আদনান ইমাম। তাঁরা সবাই এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply