মজিবর রহমান নাহিদ :::
মহান পেশা সাংবাদিকতায় বরিশালের নেতা হিসেবে যে কয়েক জনকে ধরা হয় তার মধ্যে অন্যতম মীর মনিরুজ্জামান। তিনি বরিশাল রিপোর্টাস ইউনিটির সভাপতি,সাধারন সম্পাদক, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক সহ বরিশালের নামকরা বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। মীর মনিরুজ্জামান ১৯৭৮সালের দিকে বরিশাল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘চিরন্তন বাংলা’ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের পরে আঞ্চলিক সাপ্তাহিক ‘লোকবানী’ ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক নব অভিযান, দৈনিক দেশ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে নাঈমুল ইসলাম খান সম্পাদিত দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় বরিশাল অফিসে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন তিনি। সেখানে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০০৮ সালের শেষ দিকে প্রকাশক লেঃ, কর্নেল (অবঃ) কাজী শাহেদ পত্রিকাটি লে অফ ঘোষনা করে বন্ধ করে দিলে মীর মনিরুজ্জামান নতুন করে ঢাকার কোন পত্রিকায় যোগদান করেননি। তবে ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বরিশাল থেকে প্রকাশিত আঞ্চলিক দৈনিক সত্য সংবাদ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ তার সম্পাদনা এবং প্রকাশনায় দৈনিক বরিশালের কথা পত্রিকার কার্যক্রম শুরু হয়। গত ২৪ফেব্রুয়ারী দৈনিক আজকের তালাশের অনলাইন ভার্সন চলছিলো তখন। অফিসে নিউজের কাজের ফাকে একটু ফেইসবুকে ঢুকেছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ে চ্যানেল ২৪ এর ক্যামেরাপার্সন শাহিন সুমন ভাইয়ের আপলোডকৃত স্ট্যাটাস সাংবাদিক মীর মনিরুজ্জামানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেয়া হচ্ছে। সংবাদটি দেখেই মনির কাকার ছেলে বন্ধু মীর অলিকে কয়েকবার ফোন দেই কিন্তু ফোনে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ মিনিট পাঁচেক পরে একটি ফোন। ফোনটি করেছিলো ইনডিপেডেন্ট টেলিভিশনের বরিশাল প্রতিনিধি সিনিয়র সাংবাদিক মুরাদ আহমেদ এর ছেলে সান। ওপাশ থেকে সান বললো,‘নাহিদ ভাইয়া কিছু শুনছো’ আমি বললাম ‘কি হইছে ভাইয়া?’ সান বললো ‘মনির কাকা আর নেই’ কথাটি শোনার পরে যেন পুরো স্তব্দ হয়ে গেলাম। কিছু বলার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। সানকে কোনরকম কিছু বলে ফোনটা কেটে দিয়ে তারাতারি করে চলে গেলাম মনির কাকার বাসায়। গিয়ে দেখি বরিশালের বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক ইতিমধ্যে সেখানে উপস্থিত হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণ পরেই নিয়ে আশা হলো মনির কাকার লাশ। ক্রমশই যেন জনসমুদ্রে পরিনত হলো পুরো শীতলাখোলা এলাকা। অলি,অলির ছোট ভাই মাফি,আন্টি (অলির আম্মু) এবং সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পরেছেন। কে কাকে সান্তনা দিবে সে ভাষা কারও নেই। অলির ছোট বোন মনির কাকার আদরের রাজকণ্যা সিজদার বোঝার ক্ষমতা হয় নি তার বাবা আর বেঁচে নেই। বেশ কয়েকঘন্টা বুকে আগলে রেখেছিলাম ওকে। প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখেই যেন এ কান্না শুরু হয়ে যায় তার দীর্ঘ দিনের সহকর্মী ও অন্যান্য সাংবাদিকদের। ছুটে আসেন সাবেক এমপি মজিবুর রহমান সরোয়ার, বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাইদুল ইসলাম,মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি এ্যাড, গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, সাধারন সম্পাদক এ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীর, সিনিয়র যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতাকর্মীরা। পরদিন সকালে লাশ নেয়া হয়েছিলোর তার প্রিয় জায়গা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবে। সেখানে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানায় প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা। এরপরপরই সহকর্মীরা কাধে করে তার মরদেহ নিয়ে যায় বরিশাল রিপোর্টাস ইউনিটিতে। সেখানেও তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানায় রিপোর্টাস ইউনিটির নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা। ঐ দিনই দুপুরে যোহর বাদ তার জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় বিএম স্কুল মাঠে। সেখানে অংশ নেয় তার মামাতো ভাই শওকত হাসানুর রহমান রিমন এমপি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আহসান হাবিব কামাল, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান, বিএমপি কমিশনার এস এম রুহুল আমিন, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রিয় ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল, সিনিয়র সাংবাদিক এ্যাড. এসএম ইকবাল, নজরুল ইসলাম চুন্নু, মু. ইসমাইল হোসেন নেগাবান, নাছিম উল আলম, এম এম আমজাদ হোসাইন, বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আনিসুর রহমান খান স্বপন, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারন সম্পাদক মুরাদ আহম্মেদ, স্বপন খন্দকার, মাহমুদ হোসেন চৌধুরী, এম মোবারক আলী, বরিশাল ক্লাব লিমিটেডের সভাপতি কাজী মফিজুল ইসলাম, দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যুরো চীফ লিটন বাশার, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, দৈনিক আজকের পরিবর্তন’র প্রকাশক ও সম্পাদক কাজী মিরাজ মাহমুদ, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এসোসিয়েশনের সভাপতি হুমায়ুন কবির, কাউন্সিলর মোশারেফ আলী খান বাদশা, জাকির হোসেন জেলাল, গাজী নঈমুল হোসেন লিটু, মীর জাহিদুল কবীর জাহিদ, জিয়াউদ্দিন সিকদার জিয়া, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান খান ফারুক, জেলা দক্ষিণ বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক এ্যাড. আবুল কালাম শাহীন, এড. আলী হায়দার বাবুল, এড গোলাম মাসউদ বাবলু, জাপা নেতা বশির আহমেদ ঝুনু, সাংবাদিক ফিরদাউস সোহাগ, গিয়াস উদ্দিন সুমন, রাহাত খান, বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারন সম্পাদক কামরুল আহসান, সাবেক সাধারন সম্পাদক আলী জসিম, সাবেক সভাপতি নজরুল বিশ্বাস, বরিশাল মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক খলিলুর রহমান, সাংবাদিক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কেএম তারেকুল আলম অপু, বরিশাল কোর্ট রিপোর্টাস ইউনিটির সভাপতি কেএম নয়ন সহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-পেশাজীবী-স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। জানাযা শেষে তাকে নগরীর মুসলিম গোরস্থানে দাফন করা হয়। । মীর মনিরুজ্জামান ও তার পরিবারের সাথে আমার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই কিন্তু রক্তের চেয়েও গভীরভাবে জড়িত আমি দীর্ঘ দিন ধরে ঐ পরিবারটির সাথে। ছোট বেলা থেকেই মহান পেশা সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেয়াটা ছিলো আমার ইচ্ছ। স্কুল জীবন থেকেই পরিচয় মীর মনিরুজ্জামানের বড় ছেলে মীর অলিউজ্জামানের সাথে। সেই থেকে আজও দু’জন বন্ধুত্ব ধরে রেখেছি। ২০১২ সালে এমএমসি এর শিশু সাংবাদিকতার একটি পরীক্ষায় আমাদের সাংবাদিকতা সম্পর্কে ব্যাপক ধারনা দিয়েছিলেন মীর মনিরুজ্জামান কাকা। এটাই ছিলো সাংবাদিকতার হাতেখড়ি প্রশিক্ষণ আমার। সেই থেকেই তিনি আমার প্রিয় একজন মানুষ। একই বছর একটি অনলাইন পত্রিকায় কাজ শুরু করি আমি, তখন দেশে অল্প সংখ্যক কিছু অনলাইন পত্রিকা ছিলো। পরে তার সম্পাদিত দৈনিক সত্য সংবাদে কিছু দিন কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। সত্য সংবাদে প্রথম দিন ভয়ে ভয়ে গিয়েছিলাম তার কাছে। পুরো মাথায় নিচু করে কথা বলতেছি। তিনি বললো, ভয় কিসের? আমিতো তোমার বাবার মতোই। তুমি মনে করো এটা তোমাদের পত্রিকা সেভাবে এখানে কাজ করবে। কাকা বার্তা সম্পাদককে বললেন এ আজ থেকে কাজ করবে আমাদের সাথে। ছোট মানুষ, সবাই তোমরা ওকে সহযোগীতা কইরো। যে কয়দিন দৈনিক সত্য সংবাদে কাজ করেছিলাম প্রতিটিদিনই বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতেন ঠিক সন্তানকে তার বাবা যেভাবে দিক নির্দেশনা দিতেন। কিন্তু দূর্ভাগ্য পড়াশুনোর চাপে বেশিদিন আর কাজ করতে পারলাম না ঐ পত্রিকাটিতে। পত্রিকাটিতে কাজ না করলেও অলির জন্য নিয়মিত যাতায়াত ছিলো ওদের বাসায়। আন্টির সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক আমার। আন্টি খুবই ভালোবাসেন সন্তানের মতো। তাই মাঝে মাঝে বাসায় যেতাম। ২০১৫সালে বরিশালের তরুণদের জন্য ‘তারুণ্যের স্বপ্ন-২০১৫’ অনুষ্ঠান যখন করেছিলাম তখন মনির কাকা যে সহযোগীতা করেছিলেন তা কখনও ভুলে যাওয়ার মতো নয়। অনুষ্ঠানের অনেক দিন আগে থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি সহযোগীতা করেছিলেন আমাদের। তিনি তখন সহযোগীতা না করলে খুব কষ্ট হয়ে যেত আমাদের অনুষ্ঠানটি উঠাতে। শুধু কাকাই নয় অনুষ্ঠানে আন্টিও অনেক সহযোগীতা করেছিলেন। অনুষ্ঠানের দিন আয়োজক কমিটি ও পারফর্মার মিলিয়ে প্রায় ৫০ জনের জন্য আন্টি খিচুরি পাকিয়ে দিয়েছিলো যার স্বাদ আজও ভুলিনি। কাকার সাথে সবশেষ দেখা হয়েছিলো জানুয়ারী মাসে। বরিশাল তরুণ সাংবাদিক ফোরামের নির্বাচনে আমাদের নাহিদ-মারুফ প্যানেলের প্রার্থীদের নিয়ে গিয়েছিলাম কাকার কাছে দোয়া নিতে। সেখানে কাকা বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন আমাদের। হয়তো তাদের মতো এরকম মুরুব্বি মানুষের দোয়ার কারনেই আল্লাহতায়ালা আমাকে তখন সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন। আজ প্রিয় এই মানুষটি আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। তিনি মারা যাওয়ার পরে বরিশালের এমন কোন সাংবাদিক নেই যে তিনি দু:খ ভরাক্রান্ত হয় নি। সকলের প্রিয় মাঝা ভাই হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে বরিশাল মিডিয়া অঙ্গনে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করা দুষ্কর বলে মত দিয়েছেন অনেক সিনিয়র সাংবাদিকরাই। আর কেই বলবেনা ‘নাহিদ সব সময় সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকবে, তোমার লেখা যেন কখনও কারো কষ্টের কারন হয়ে না দাড়াঁয়।’ সত্যি আজ কাকাকে খুব মিস করছি। কাকা ভালো থাকুন পরপারে । আপনার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।আল্লাহ যেন আপনাকে বেহেশত নসিব করেন এই প্রার্থনা করি ।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply