শাকিব বিপ্লব ও হাফিজ স্বাধীন,বিশেষ প্রতিবেদক : মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস ধীরালয়ে বরিশাল জেলা জেঁকে ধরছে। সেই সাথে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যাও দিনোত্তর বাড়ছে। দু:সংবাদ হলো আজ বুধবার সকালে করোনা আক্রান্ত আরো এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটছে। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দুইয়ে দাঁড়ালো। এর আগে মুলাদীতে একজন করোনা আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তার নমুনা সংগ্রহের তিনদিন পর করোনা আক্রান্ত হিসেবে পজিটিভ রেজাল্ট আসে। সর্বশেষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া ব্যক্তি মাহাবুব আলম মোল্লা নগরীর রূপাতলীর বাসিন্দা। তার পারিবারিক সূত্র জানায়, তিনি রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশনে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা অবস্থায় আজ সকাল সাড়ে ১০ টায় চিকিৎসকরা তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে সকাল থেকেই বরিশাল সরকারি কলেজ সম্মুখের শ্রীচ্যার্টাজি লেনের জনৈক এক নারী করোনা আক্রান্ত হয়েছে, এমন খবর ছড়িয়ে পরলে গোটা এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে এ ধরণের কোন রোগীর সন্ধান এখনো মেলেনি, বিষয়টি গুজব। তবে শেবাচিমে করোনা ইউনিট থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, ওই রোগীর নাম বিনা হালদার। তার স্বামী একজন চিকিৎসক বলে জানা গেছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সর্বশেষ তথ্যমতে, বরিশাল জেলায় এ পর্যন্ত ৩২জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। প্রথম ১২ এপ্রিল বরিশাল জেলায় করোনা রোগী শনাক্ত হয় বাকেরগঞ্জ ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায়। এরমধ্যে বাকেরগঞ্জের বজলুর রহমান ৬৫ ও মেহেন্দিগঞ্জের আব্দুর রব মুন্সী ৬৮ উভয় শেবাচিমে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর পরীক্ষায় তাদের শনাক্ত করা হয়। এরপর থেকে তারা শেবাচিমে করোনা ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন। একই দিন ১২ এপ্রিল খবর আসে মুলাদীর সদর উপজেলার দুড়িয়ার চর লক্ষিপুর এলাকায় রতন সরদার (৫৫) করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি জানান পর সিভিল সার্জনের সহয়তায় তার নমুনা সংগ্রহের তিনদিন পর তার দেহে করোনার অস্তিত ছিলো বলে নিশ্চিত হয়।
এর কয়েকদিনের ব্যবধানে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া, বাকেরগঞ্জ ও মেহেন্দিগঞ্জে দুইজন সর্বমোট ৪জন করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের করোনা ইউনিট সেলের প্রধান সহকারী কমিশনার সুব্রত বিশ্বাস জানান, তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন মহল বলছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তর করোনা রোগে আক্রান্তে মৃতুর তালিকা নিয়ে লুকোচুরি চলছে। সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে না। আবার করোনা আক্রান্ত অনেক রোগী তাদের ঠিকানা সঠিকভাবে প্রকাশ করছে না নিজ বাড়ি লকডাউন ঘোষণা আতঙ্কে। সামাজিকভাবে বয়কট করার ভয়েও তারা নাম প্রকাশে অনিহা প্রকাশ করছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে শহলতলীর চরবাড়িয়া ইউনিয়নের ঢ়ারী মহল গ্রামে ব্যাংকার ইউসুফ আলী করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করার পর চিকিৎসকরা তাকে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা বললেও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে তা নাকচ করে দেয়। কিন্তু তার দাফন কার্যক্রম দেখে বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, তিনি সমূহ করোনা রোগে আক্রান্ত ছিল। তার পরিবারের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তাতে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনি নিজ বাড়িতে মারা যান। এনিয়ে প্রশাসনের মধ্যে তোলপাড় দেখা যায়। অনুরূপ আরো কয়েক ব্যক্তি একই উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করলেও তাদের নমুনা পরীক্ষার পর কি রেজাল্ট এসেছিলো, সে বিষয় পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেয়নি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। করোনায় মৃত্যুর চেয়ে আক্রান্ত এবং নমুনা পরীক্ষায় সংখ্যাগত দিকটি তুলে ধরার বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল রূপাতলীর মোল্লা বাড়ির ৬০ উর্ধ্ব মাহাবুব আলম মোল্লা জ্বর ও শ্বাসকষ্টসহ করোনার সব কয়েটি উপসর্গ নিয়ে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরে তার পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ ধরা পরে। তিন দিনের মাথায় তিনি মারা গেলেন। তার পরিবার বিষয়টি বরিশাল বাণীকে নিশ্চিত করেছে। জেলা সিভিল সার্জন মনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয় এখনো অবগত নয় বলে এই প্রতিবেদককে জানান। উল্লেখ যেতে পারে বরিশাল সদরে এই প্রথম কোনো করোনা রোগীর মৃত্যু ঘটলো তবে ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, মাহাবুব আলম মোল্লা করোনা রোগী হওয়ায় স্বাস্থ্যদপ্তরে নির্দেশনার আলোকে তার দাফন করা হবে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে তার লাশ বরিশালে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে। নিহতের স্বজন সুরুজ মোল্লা জানান, মরদেহ সন্ধ্যা নাগাদ বরিশালে পৌছতে পারে।
জেলা প্রশাসকের করোনা সেলের মুখোপাত্র সুব্রত বিশ্বাসের দেয়া তথ্যমতে, বরিশাল শহরে এই পর্যন্ত মোট ৯জনের দেহে করোনা ভাইরাসের অস্তিত পাওয়া গেছে। এরমধ্যে শেবাচিম মেডিকেলে ইন্টার্নী ডাক্তার আমিনা ইসলাম নওশীন, ডাক্তার তরিক, ডাক্তার নাজমুল আলম ও একজন বিভাগীয় সহকারী ডাক্তার তরিকুল ইসলামসহ অপর দুই নার্স রয়েছেন। এছাড়া শেবাচিম মেডিকেল কলেকের একজন শিক্ষার্থীসহ কাউনিয়া এলাকার ডাক্তার সিয়াব উদ্দিন, রূপাতলী তরুণ বয়সী হুমায়ূন কবির ও বরিশাল কলেজ সংলগ্ন চ্যাটার্জী লেনের বিনা হারদার। শহরতলীর কাশিপুরের বাসিন্দা শেবাচিমের নার্স সুইটি বেগম তার দেহে করোনা অস্তিত ধরা পড়ার পর ১৬ এপ্রিল থেকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসালয়ের করোনা ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, আজ সুস্থ্য হয়ে তার বাড়ি ফেরার কথা রয়েছে। তার সাথে বরগুনার আবুল কালাম আজাদও সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। উভয়ের দুই দফা পরীক্ষা শেষে বর্তমানে করোনা মুক্ত রেজাল্ট এসেছে।
ওই সূত্রটি জানায়, শেবাচিমে করোনা ইউনিট ও আইসোলেশনে মোট ৩২জন রোগী এই রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গোটা জেলার পরিসংখ্যনে এইটাই হচ্ছে সর্বচ্চ রোগীর সংখ্যা। সবচেয়ে বেশি করোনা রোগীর আক্রান্ত হয়েছে সদর উপজেলায়। ৪জন চিকিৎসক ও ২জন নার্সসহ একজন চিকিৎসা শিক্ষার্থী এই তালিকায় রয়েছে। কাউনিয়ার ডাক্তার সিয়াব উদ্দিন বাবুগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক বলে জানা গেছে। গত সপ্তাহে বাবুগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারসহ একজন নার্স ও রোগীর দেহে করোনা ধরা পড়লে উপজেলা হাসপাতালটি লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এখন পর্যন্ত ৮জন করোনা রোগীর অস্তিত নিয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বলছে, করোনা বরিশালে ক্রমন্বয় সংক্রমিত হয়ে এলাকায় বিস্তৃত ঘটছে। বিশেষ করে মেহেন্দিগঞ্জ, বাবুগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ এলাকা ডেঞ্জার জোন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরে।
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply