নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনা দুর্যোগে বরিশালে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ ওএমএস’র কার্ড নিয়ে চলছে তেলেসমাতি কারবার। খাদ্য মন্ত্রণালয় এই কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশনা দিলেও তা যেন বরিশাল প্রেক্ষাপটে পাত্তাই পাচ্ছে না বা দেওয়া হচ্ছে না। কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা সর্বাগ্রে থাকলেও ক্ষমতাসীনদের চাপাচাপিতে মাঠপর্যায়ে পাকিয়ে যাচ্ছে তালগোল। আবার কোথাও কোথাও নিম্নবিত্তদের বিশেষ ওএমএস’র কার্ড আ’লীগ দলীয় নেতাকর্মীরা ভাগাভাগি করে নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
বিশেষ করে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ত্রিশটি ওয়ার্ডের ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ায় দেশের ক্রান্তিলগ্নে সরকারের এই মানবিক উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে করে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ বঞ্চিত হলেও ক্ষমতাসীন মহলের ভয়ে বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। তবে এনিয়ে ওয়ার্ড আ’লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় একাধিক কাউন্সিলর কার্ড প্রাপ্তির তালিকা পর্যন্ত জমা করাতো দূরের কথা উল্টো শাস্তি-খড়গের ভাবনায় নিজেকে রক্ষায় আড়াল করে রেখেছেন। আবার কোন কোন ওয়ার্ড কাউন্সিলর স্থানীয় আ’লীগ নেতৃবৃন্দের সুপারিশে সেই ভাগাভাগির তালিকা জমা করে পড়েছেন বিপাকে। বিতর্কিত ওই তালিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়।
উল্লেখ্য- মারণঘাতী করোনা মহামারিতে ‘লকডডাউন’ বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডের কর্মহীন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোচালক, পরিবহন শ্রমিক, ভিক্ষুক-তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া), ভবঘুরেসহ নিম্নবিত্তদের অনুকূলে বিশেষ ওএমএস কার্ড বরাদ্দ দিয়ে তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে গত ১২ এপ্রিল নির্দেশনা দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। এই তালিকাকরণে স্ব-স্ব ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলে ওই সারিতে থাকাদের শনাক্তে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সিটি কর্পোরেশন মাঝপথে এই সংক্রান্ত একটি কমিটি করে দিয়ে কাউন্সিলরসহ আওয়ামী লীগ, যুব-ছাত্রলীগসহ অন্তত সাতজনকে সদস্য করে চিহ্নিতকরণে নির্দেশনা দেয়।
একাধিক কাউন্সিলর জানান, তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও সিটি কর্পোরেশন কমিটি করে দেওয়ার পরে পুরো প্রক্রিয়াটি এলোমেলো হয়ে যায়। ওয়ার্ড আ’লীগ, যুব-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা দরিদ্র শ্রেণির মানুষ চিহ্নতকরণের বিপরিতে কার্ড ভাগাগিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার পুরো দায় কাউন্সিলরকে বহন করতে হবে এধরনের কঠোর নির্দেশনায় একাধিক কাউন্সিলরের সাথে কমিটির সদস্যদের দেখা দেয় মতবিরোধ। ফলে দায় এড়াতে অন্তত ১০ জনের বেশি কাউন্সিলর সময়সীমা হলেও তালিকা জমা করেনি। আবার অনেকে জমা করলেও নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেছে। শোনা যাচ্ছে- কোন কোন ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র মনপুত না হওয়ায় তাদের এই ওএমএস কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি। যা নিয়ে চলমান অসন্তোসের আভাস পাওয়া গেছে। অথচ কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকার বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিস্তার অভিযোগ সত্তে¡র এই কমিটির কোন হস্তক্ষেপ প্রতীয়মাণ নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অভিযোগ করেছেন- খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে প্রতিটি ওয়ার্ডে ৪০০ জনকে চিহ্নিতকরণে নির্দেশ দিলেও সিটি কর্পোরেশন তাদের মনপুত লোক অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ায় যাচাই-বাছাই তো দুরের কথা, যে যার মতো করে ভাগ বসাতে চাইছেন। কোন কোন ওয়ার্ডে আ’লীগ সভাপতি-সম্পাদক ১০০টি, যুব ও ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক ৫০টি করে নিয়ে নিজেদের কাছের ব্যক্তি-বিশেষের মাঝে বিরতণ করছেন। ফলে সরকারের এই মানবিক উদ্যোগ থেকে বাদ পড়তে চলছেন প্রকৃত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। উদাহরণস্বরুপ শহরের ১০, ১১, ১৫, ২২,২৪ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড প্রণয়নকৃত তালিকা নিয়ে দেখা দেয় তুমুল বিতর্ক। এই সব ওয়ার্ডসমূহের তালিকা থেকে প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বাদ পড়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য ইতিমধ্যে এই অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে বরিশাল জেলা বাসদ নেত্রী ডা. মণীষা চক্রবর্তী ওএমএস কার্ড বিতরণ সংক্রান্ত বরিশাল নগর কমিটি প্রধান বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেন এবং সুষ্ঠু তদন্ত চেয়েছেন। জানা গেছে- সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ অনিয়মের বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইয়ামিন চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানের ভাষ্য হচ্ছে- বিষয়টি নিয়ে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র সাথে একাধিকবার কথা হয়েছে। সর্বশেষ যে অভিযোগ উঠেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়- কার্ড বিতরণে নিয়ে ক্ষমতাসীন মহলের ভাগাভাগি তোড়জোড় দেখে নিজের দায় এড়াতে অনেক কাউন্সিলর এ দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত হোসেন খান লাবু নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় পরবর্তীতে দায়িত্ব পান সংরক্ষিত কাউন্সিলর ইসরাত জাহান লাভলী। এই নারী কাউন্সিলর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সুপারিশসহ তালিকা জমা দেওয়ার পরে তা প্রকাশ পেলে শুরু হয় তোলপাড়।
অনুরুপ বিতর্ক দেখা দেয় ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এটিএম শহীদুল্লাহ কবিরের তালিকা নিয়েও। এই ওয়ার্ডের বরফ কল এলাকার স্থানীয় রাজিয়া এবং মিলন বেগম নামের দুই বাসিন্দা জানান আমরা বাসা বাড়িতে কাজ করি। করোনা ভাইরাসের কারণে বাসা বাড়ির কাজ বন্ধ। এখন না খেয়ে মরছি। মেয়র মহোদয় আমাদের একবার ত্রাণ দিয়েছিল। কিন্তু এরপর আর কেউ আসেনি। কাউন্সিলর সাহেব আমাদের কার্ড না দিয়ে এক ঘরে একাধিক কার্ড দিয়েছেন। জুয়েল তার পিতা কালাম, শাহীন, খালতো বোন আনোয়ারা কে কার্ড করে দিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই স্বচ্ছল, কিন্তু আমরা অসহায় আমাদের কার্ড দেয়নি।
হাসিনা ও পারভীন নামের দুই বাসিন্দা জানান, এভাবে চলতে থাকলে সন্তানদের নিয়ে গলায়় দড়ি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।স্যার আপনারা নিউজ করে মাননীয় মেয়র মহোদয় কে জানিয়ে দেন। আমরা খুব খারাপ অবস্থায়় আছি। আমাদের একটা ওএমএস কার্ডের ব্যবস্থা করে দেয়। তাহলে দু’মুঠো ভাত খেয়ে যদি বেঁচে থাকতে পারি। ভিক্ষুক ফরিদা বেগম আরও জানান কালামের স্ত্রী পেয়ারা বেগম কাউন্সিলরের খাস লোক।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,১০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের এই স্বজনপ্রীতির কারণে স্থানীয় জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে এর ফলে কাউন্সিলর সাহেব অফিসের থেকে বাসায়় বেশি থাকেন।
আ’লীগ নেতৃবৃন্দ পরবর্তীতে নিজেদের সুপারিশ বা মনপুত ব্যক্তিকে তালিকায় স্থান দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও কাউন্সিলর বলছেন- আমি এই ব্যাপারে কিছু জানিনা। ১০ নং ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল এবং তার পিতা কালাম একই পরিবারে থাকা সত্বেও কিভাবে দুইটি কার্ড করে জানতে চাইলে সে বলে আমি কিছু জানিনা আমি একা কার্ডের দায়িত্বে না, ওয়ার্ডের আ’লীগের সভাপতি সাইফুল, ও সাধারন সম্পাদক শেখর আছে বলে সমস্ত বিষয় এড়িয়ে যায়। অনুরুপ মন্তব্য করে ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান বিপ্লবও এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক হস্তপেক্ষের কারণে প্রকৃতরা বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন।
সূত্রগুলো জানায়- শুধু মাত্র তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম নয়, মুল বিতর্ক শুরু হয় ওয়ার্ড পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে করা সিটি কর্পোরেশন কমিটি তালিকা ঘোষণার পরপরই। নিশ্চিত হওয়া গেছে- সিটি মেয়রের সাথে যেসব কাউন্সিলর দূরত্ব বজায় রাখছেন তাদের যাচাই-বাছাই এই কমিটিতেই রাখা হয়নি। এনিয়ে কাউন্সিলরদের মাঝে ক্ষোভ-অসন্তোস উভয়ই বিরাজ করছে। বিশেষ করে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদ হোসেন মোল্লা কালামও এ কমিটি স্থান পাননি।
এক্ষেত্রে এই কাউন্সিলরের ভাষ্য হচ্ছে- জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে যাচাই-বাছাই কমিটি করায় প্রকৃত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ সাহায্য বঞ্চিত হচ্ছে। তার ওয়ার্ডের দায়িত্বে নারী কাউন্সিলসহ আ’লীগ নেতৃবৃন্দকে দায়িত্ব দেওয়ায় তারা তাদের মনপুতদের কার্ড দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত হচ্ছে- করোনা মহামরিতে এই মানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনিয়ম হলে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ সুফল বঞ্চিত হবেন। এতে করে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার সাথে সাথে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা অনেকাংশে কমে আসবে। ফলে বিষয়টি দায়িত্বশীল মহলের অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি বলে মন্তব্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে কার্ড বিতরণের পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ চলছে বলে দাবি করেন জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান।’
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply