, ,

শিরোনাম :
এক দশকে বরিশালে হারিয়েছে ১ হাজারের বেশি পুকুর ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ছাত্রদল নেতা দল থেকে বহিষ্কার সুগন্ধা নদীর ভাঙন : নিঃস্ব শত পরিবার, ঝুঁকিতে বাবুগঞ্জ বাজার-বিমানবন্দর পটুয়াখালীর গলাচিপায় পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে ১৩৫ লিটার চোলাই মদ ও গাঁজাসহ পিতা-পুত্র আটক একসঙ্গে ৬৮ এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার করল সরকার নাশকতার মামলায় আ’লীগের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা, বাকেরগঞ্জে চাঞ্চল্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের বিদায়ী সাক্ষাৎ বাংলাদেশের ওষুধে ১০০ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা ট্রাম্পের নাপা ছাড়া মিলছে না ডেঙ্গুর চিকিৎসা প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

এক দশকে বরিশালে হারিয়েছে ১ হাজারের বেশি পুকুর

dynamic-sidebar

খবর বরিশাল ডেস্ক :

বরিশাল জেলায় গত এক দশকে এক হাজারের বেশি পুকুর হারিয়ে গেছে। ভরাট, দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নকে এর কারণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং শহরের ধীরে ধীরে দেবে যাওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মৎস্য অধিদপ্তরের করা জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জরিপ অনুযায়ী, বরিশাল জেলায় এখন পুকুর আছে ২০ হাজার ৬৯২টি। ২০১৫ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৫ শতাংশ কম। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান জানান, এর মানে এই সময়ে এক হাজারের বেশি পুকুর নেই হয়ে গেছে। তাঁর অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভবন তৈরি ও বিক্রির জন্য আবাসিক প্লট গড়তে পুকুর ভরাট করছেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সরকারি, দুই ধরনের পুকুরই ভরাটের শিকার হচ্ছে।

সরকারি জলাশয় রক্ষায় আইন থাকলেও নজরদারি ও প্রয়োগের ঘাটতির সুযোগে অনেক পুকুর ভরাট হয়ে গেছে বলে জানান কর্মকর্তা ও পরিবেশকর্মীরা। বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২০১১ সালের মহাপরিকল্পনায় নগরে ৪৩৬টি পুকুর চিহ্নিত ছিল। এর মধ্যে ১৫৫টির বেশি সরকারি মালিকানার। করপোরেশন এখন হালনাগাদ সংখ্যা দিতে পারেনি। প্রতিবেদক নিজে অনুসন্ধান করে দেখেছেন, ওই পুকুরগুলোর প্রায় অর্ধেকের আর হদিস মেলে না।

পুকুর ভরাটের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের যোগ নিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান স্থপতি সাইদুর রহমান সতর্ক করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, পুকুর ভূগর্ভের পানির স্তরে পানি জোগান দিয়ে সেই স্তরের ভারসাম্য রাখে। ২০১১ সালে নগরে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরে খাওয়ার উপযোগী পানি পাওয়া যেত। এখন ১ হাজার ফুটের নিচে না গেলে তা মেলে না। কংক্রিটের আবরণ বাড়ায় এবং পুকুর ভরাট হওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ কমেছে। ফলে ভূগর্ভের পানির স্তর ক্রমে নামছে। এর গুরুতর পরিণতি হতে পারে, এমনকি ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে, বলেন তিনি।

ভরাটের বাস্তব উদাহরণ প্রতিবেদকের নিজের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে এসেছে। গত মাসে তিনি দেখেন, নগরের বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশের একটি পুকুরের ৬০ শতাংশের বেশি ভরাট হয়ে গেছে। জমির মালিকানা দাবি করা একটি গোষ্ঠী এই ভরাট করে। পুলিশ ও অন্য সংস্থাকে জানানো হলেও প্রায় ২০ দিন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা হয়নি বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়। শেষ পর্যন্ত সিটি করপোরেশন হস্তক্ষেপ করে ভরাট বন্ধ করে। বরিশাল ডায়াবেটিক হাসপাতালের সামনে থাকা বিআইডব্লিউটিএর একটি পুকুর এবং নার্সিং কলেজের কাছের দুটি পুকুরও সম্প্রতি আংশিক ভরাট হয়েছিল। সেখানেও করপোরেশন এসে কাজ থামায়। কাশীপুরের সীতারাম দীঘির একটি অংশ ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। কাউনিয়া ব্রাঞ্চ রোড, বৈদ্যপাড়া ও কাউনিয়া এলাকার কয়েকটি পুকুরও হারিয়ে গেছে।

সবচেয়ে অস্বস্তিকর তথ্য হলো, ভরাটে রাষ্ট্রের নিজের ভূমিকাও আছে। আদালত চত্বরের ভেতরের পুকুরটি ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। বেলস পার্কের কাছের একটি বড় পুকুর ভরাট করে সেখানে সরকারিভাবে একটি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ তৈরি করা হয়েছে। নগরের অন্যান্য অংশে সরকারি পুকুর দখল ও ভরাটের আরও অভিযোগ আছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি পুকুর ভরাটের অভিযোগ জমছে, যার অনেকগুলোতে প্রভাবশালীরা জড়িত। তাঁদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে ভরাট ও দখলের আগেই পুকুরের শ্রেণি বদলে ফেলা হয়। অধিদপ্তরের বরিশালের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন জানান, গত তিন মাসে অন্তত ১০টি বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, এর তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। একই ধরনের অভিযোগে অন্তত পাঁচটি মামলাও হয়েছে। তাঁর মতে, ভরাটের খবর আসামাত্র নোটিশ দেওয়া হয়, তবু ভরাট পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি বদলে ফেলার পরও ভরাট চলতে থাকে।

 

সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক তুনু রানী কর্মকার বলেন, একসময় নগরে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এক হাজারের বেশি পুকুর ও বড় জলাশয় ছিল। ভবন তৈরি ও আবাসিক প্লট বানাতে এর বেশির ভাগ ভরাট হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়ক লিংকন বায়েন জানান, গত এক বছরে পুকুর ভরাট নিয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে, এর দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। পরিবেশকর্মী শুভঙ্কর চক্রবর্তীর হিসাবে, গত এক দশকে নগরে অন্তত ২০০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর ভরাট হয়েছে। নগরবাসী ও পরিবেশবাদীরা বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ, সরকারি জলাশয়ের নিয়মিত তদারকি এবং অবৈধ ভরাট ও দখলে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে দেখলে ক্ষতির আকার আরও স্পষ্ট হয়। জেলাজুড়ে প্রায় ৫ শতাংশ পুকুর কমেছে, অর্থাৎ ২০১৫ সালে পুকুর ছিল প্রায় ২১ হাজার ৭০০-এর মতো। কিন্তু নগরের চিত্র অনেক বেশি ভয়াবহ। মহাপরিকল্পনার ৪৩৬টি পুকুরের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ২০০-র বেশি, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জেলার গড় হ্রাসের তুলনায় এই হার বহু গুণ বেশি। এর অর্থ পুকুর হারানোর চাপ শহরে সবচেয়ে তীব্র, কারণ শহরে জমির দাম বেশি, ভরাট করে প্লট বা ভবন বানানোর লোভও বেশি। শহরের পুকুরেই আবার জলাবদ্ধতা ঠেকানো ও ভূগর্ভে পানি পাঠানোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

পানির গভীরতার হিসাবটিও ভাবনার। ২০১১ সালে ৮০০ ফুট থেকে এখন ১ হাজার ফুটের নিচে, অর্থাৎ অন্তত ২০০ ফুট, যা আগের গভীরতার প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। মাত্র ১৫ বছরে পানি এত নিচে নামা দ্রুত অবনতির লক্ষণ। সরকারি হিসাবে পুকুর ভরাটকে একমাত্র কারণ বলা হয়নি। প্রধান স্থপতি কংক্রিটের বিস্তারকেও দায়ী করেছেন। অর্থাৎ ভূগর্ভের পানির সংকটে পুকুর ভরাটের পাশাপাশি শহরের পাকা কাঠামোর বিস্তারের ভূমিকাও আছে। তবে দুটি কারণের কোনটির অবদান কতটা, প্রতিবেদনে তার কোনো বৈজ্ঞানিক হিসাব নেই। দেবে যাওয়ার শঙ্কাও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হিসেবেই দেখা উচিত, এখনো নিশ্চিত পরিণতি নয়।

আইন প্রয়োগের চিত্রে বড় ফাঁক দেখা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর তিন মাসে ১০টি নোটিশ দিয়েছে আর পাঁচটি মামলা করেছে। কিন্তু এই সময়েই বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুর ৬০ শতাংশের বেশি ভরাট হয়ে যায়, আর প্রায় ২০ দিন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ হয়নি। নোটিশ দিয়ে ভরাট ঠেকানো যাচ্ছে না, এ কথা কর্মকর্তা নিজেই মেনেছেন। নোটিশ পাওয়া ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভরাট বন্ধ হয়েছে কতটি, মামলাগুলোর অগ্রগতি কী এবং কারও শাস্তি হয়েছে কি না, প্রতিবেদনে তা নেই। বেলার বক্তব্যেও দেখা যায়, বছরে মাত্র তিনটি নোটিশ গেছে। এই সংখ্যা হারানো পুকুরের তুলনায় নগণ্য।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ শ্রেণি বদল নিয়ে। কর্মকর্তারা বলছেন, ভরাটের আগে অনেক সময় পুকুরের শ্রেণি বদলে ফেলা হয়। আর কখনো শ্রেণি বদলের পরও ভরাট চলে। এর মানে আইনি ফাঁক বা রেকর্ড পরিবর্তনের কোনো ফাঁকফোকর ব্যবহার হচ্ছে। কীভাবে শ্রেণি বদল হয় এবং কার অনুমোদনে, সে প্রশ্নের উত্তর প্রতিবেদনে নেই। এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে যত নোটিশই দেওয়া হোক, কাগজে পুকুর মুছে যাবে, ভরাটও বৈধ দেখানো যাবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল তোলার প্রশ্নটিও এখানে বড়। আদালত চত্বরের পুকুর ভরাট ও সরকারি স্কুল-কলেজ তৈরিতে পুকুর হারানোর ঘটনা বোঝায়, ভরাট শুধু বেসরকারি প্রভাবশালীরা করছেন না। রাষ্ট্র নিজেই কখনো কখনো এর অংশ হয়ে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজ তৈরির প্রয়োজন যেমন বাস্তব, তেমনি জলাশয় রক্ষার দায়ও আছে। একই সরকার যদি এক দিকে আইন করে জলাশয় রক্ষার কথা বলে, আবার অন্য দিকে নিজেই ভরাট করে, তখন সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারাতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে বিকল্প জমি ছিল কি না বা পরিবেশগত মূল্যায়ন হয়েছিল কি না, তা প্রতিবেদনে জানা যায় না।

প্রতিবেদনের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। মৎস্য অধিদপ্তরের জরিপের পদ্ধতি, পুকুরের সংজ্ঞা ও আকারের মানদণ্ড এবং ২০১৫ সালের তথ্যের উৎস প্রকাশ করা হয়নি। কর্মকার আর চক্রবর্তীর হিসাব যথাক্রমে এক হাজারের বেশি জলাশয় ও ২০০ ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরের কথা বলে, তবে এগুলো তাঁদের নিজস্ব অনুমান বা অভিজ্ঞতা, সরকারি জরিপ নয়। দুই সংখ্যার তুলনা করা ঠিক হবে না, কারণ একটিতে পুকুরের পাশাপাশি বড় জলাশয়ও ধরা হয়েছে। অভিযুক্ত ভরাটকারীদের বক্তব্য প্রতিবেদনে নেই। বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশের পুকুরের ক্ষেত্রে যে গোষ্ঠী মালিকানা দাবি করছে, তাদের অবস্থান জানা যায়নি। পুলিশ কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, সে ব্যাখ্যাও পুলিশের পক্ষ থেকে আসেনি।

সব মিলিয়ে সমস্যাটি একটি ধারাবাহিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। নোটিশ দেওয়া হয়, কিন্তু ভরাট থামে না। শ্রেণি বদলের ফাঁক আছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও কখনো ভরাটে জড়িয়ে পড়ছে। এর মূল্য দিচ্ছে পুরো শহর, জলাবদ্ধতা, নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানি এবং ভবিষ্যতের দেবে যাওয়ার ঝুঁকির মাধ্যমে। সামনে তিনটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। প্রথমত, সিটি করপোরেশন নগরের বর্তমান পুকুরের হালনাগাদ ও প্রকাশ্য তালিকা করে কি না, যা ছাড়া নজরদারি সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, শ্রেণি বদলের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত হয় কি না। তৃতীয়ত, পাঁচটি মামলা ও ১০টি নোটিশ কোনো বাস্তব ফল আনে কি না এবং ভরাটকারীদের শাস্তি হয় কি না। এগুলো না হলে নগরবাসীর দাবি কাগজেই থেকে যাবে, আর হারানো পুকুরের তালিকা আরও দীর্ঘ হবে।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All Rights reserved © 2018 KhoborBarisal.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net