বার্তা পরিবেশক, শফিক মুন্সি::
বরিশালের চরবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেন্দ্রটি নিরাপদ প্রসব, প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান এবং কিশোর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বরিশাল সদর উপজেলার চরবারিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র সেবাদানের দিক থেকে আলাদাভাবে নজর কেড়েছে পুরো উপজেলা জুড়ে। প্রতিমাসে গড়ে পাঁচটি নরমাল ডেলিভারি করতে সফল হওয়ায় এলাকার মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে নিরাপদ সন্তান প্রসব ও প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানের নির্ভরতার প্রতীক। এছাড়াও কিশোর – কিশোরীদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা কর্ণার স্থাপনের মাধ্যমে বয়ঃসন্ধি স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য এই সেবা কেন্দ্রটি কাজ করে যাচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন ধরণের আধুনিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও পুরো উপজেলা জুড়ে উক্ত কেন্দ্রটি দৃষ্টি কেড়েছে সংশ্লিষ্ট সবার।
সরেজমিনে দেখা যায়, ২৪ ঘন্টা ডেলিভারি সুবিধা প্রদান এবং নরমাল ডেলিভারির প্রতি উৎসাহীকরণের ফলে এলাকার প্রসূতি মায়েদের পরিবারের প্রথম পছন্দই থাকে এই কেন্দ্রের সহায়তা নেওয়া। বিনামূল্যে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা ( প্রসব পূর্ব সেবা, সাধারণ প্রসব সেবা, প্রসবোত্তর সেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, নবজাতকের সেবা ইত্যাদি) নিশ্চিত করতে পারায় আগের তুলনায় বেড়েছে সেবা গ্রহীতার সংখ্যাও। এসব ব্যাপারে কথা বললে উক্ত কেন্দ্রটির এফডব্লিউভি ফেরদৌসী আক্তার জানান, ” ইউনিয়ন পরিষদের সার্বক্ষণিক তদারকি এবং বিভিন্ন এনজিওর প্রতিনিধিদের পরামর্শমূলক সহায়তায় সেবার মান ও পরিবেশ দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র দুই বছর আগের চেয়েও এখন সেবাগ্রহীতার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর – কিশোরীদের বয়ঃসন্ধি স্বাস্থ্য সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য। ” গত মাসেই ২৭ টি ইমপ্লান্ট (দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিরোধক সেবা) করার কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন ,”পরিবার পরিকল্পনা সেবা যার দরকার তিনি যেন এই কেন্দ্র থেকে কোনোভাবে ফিরে না যায় সে ব্যাপারে তারা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে। ”

স্থানীয় সরকারের তত্ত্বাবধান ও বাজেট প্রাপ্তিকে সেবার মান বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে আরো দেখা যায়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মেরী স্টোপসের তত্ত্বাবধানে সুশীলনের কর্মীদের তৎপরতায় স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সেবাকেন্দ্রটির সমন্বয়ও বেড়েছে আগের চেয়ে বেশি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পরিবার পরিকল্পনা সেবার মানোন্নয়নে দেওয়া হয়েছে আলাদা বাজেট। এবছর ইউনিয়ন পরিষদের বাজেটে পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয় ১ লক্ষ টাকা। সেবা গ্রহীতাদের যাতায়াতের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা, ভরাট করা হয়েছে ডোবা, বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দেওয়া হয়েছে সোলার প্যানেল, কিশোর –কিশোরীদের কাউন্সেলিং কর্ণারে দেওয়া হয়েছে আসবাবপত্র। এছাড়াও সেবা গ্রহীতাদের ওয়েটিং রুমে দেওয়া হয়েছে ফ্যান যার ফলে সব ধরণের সেবাগ্রহীতাগণের জন্য সেবাগ্রহণের অনূকুল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শ, জন্মনিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ( স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি), পুষ্টি সেবা, যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ক সেবা ইত্যাদি বর্তমানে এক ছাদের নিচেই পায় যেকোনো সেবাগ্রহীতা।
পরিবার পরিকল্পনা সেবায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য বরিশাল সদর উপজেলা কর্তৃক এবছর সম্মাননা পেয়েছিলেন চরবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মাহতাব হোসেন সুরুজ। সরকারি বাজেটের পাশাপাশি ব্যাক্তিগত খাত থেকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটিকে সহায়তা করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, ” স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির গুরুত্ব বিবেচনা করে আমি আমার পৈতৃক জমির কিছুটা অংশও কেন্দ্রটিকে দান করে দেই। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বিশেষ করে সুশীলন ও মেরিস্টোপস প্রতিনিধিদের পরামর্শে আমি সেবার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে অবহিত হই। তারা সেবার মান বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে কাজটিকে আরও বেগবান করতে সহায়তা করে। ” ভবিষ্যতে সেবা কেন্দ্রটির মান বৃদ্ধিতে তিনি আরও উন্নয়নমূলক কাজ করারও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মাহতাব হোসেন সুরুজ এর ভাষ্যমতে ইউনিয়ন পর্যায়ের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক কমিটির মাসিক সভায় খুব গুরুত্ব সহকারে প্রতিটি বিষয় আলোচনা করা হয়। এছাড়া জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সরকারি প্রতিটি ক্যাম্প ও কর্মসূচি সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে পালন করা হচ্ছে নিয়মিতভাবে। তিনি আরও বলেন, ” ইউনিয়ন পরিষদের বাজেটে পরিবার পরিবার পরিকল্পনার সেবার মান বৃদ্ধিতে আলাদা বরাদ্দ খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এছাড়াও সেবার মানোন্নয়নে স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততাকরণও জরুরী। এক্ষেত্রে নীতিমালা জোরদার করতে হবে।” তবে এত অর্জনের মাঝেও একজন এমবিবিএস ডাক্তারের অভাব ম্লান করে দিচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা সেবায় উক্ত ইউনিয়ন পরিষদ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটির কৃতিত্ব। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির দায়িত্বরতদের ভাষ্যমতে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রটির ডাক্তারের পদটি শূন্য আছে৷
এ বিষয়ে মাহতাব হোসেন সুরুজ বলেন, “এমবিবিএস ডাক্তার থাকলে তাদের সেবার মান আরো বৃদ্ধি পাবে, উপকার হবে এলাকার হাজারো মানুষের।” তিনি আরও বলেন, “পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় সরকার সহ সবাইকে একযোগে কাজ করার পরিবেশ তৈরী করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি কোন নীতিমালা প্রনয়ণ করতে হয় সেটাও করতে হবে এবং নীতিমালার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। “
Desing & Developed BY EngineerBD.Net
Leave a Reply