, ,

শিরোনাম :
শেবাচিম চিকিৎসকের ঘাতকরা পর্দার অর্ন্তরালে, পুলিশের তোড়জোরে সতর্ক

শেবাচিম চিকিৎসকের ঘাতকরা পর্দার অর্ন্তরালে, পুলিশের তোড়জোরে সতর্ক

dynamic-sidebar

শাকিব বিপ্লব, (সহযোগিতায় হাফিজ স্বাধীন) : বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক ডা. এম এ আজাদ সজলের হত্যার ক্লু উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা জোর তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু ঘাতক কে এবং কিভাবে তাকে হত্যা করে লিফটের নিচে ফেলে রাখা হলো তা এক অবিশ্বাস কাহিনী বলে মনে করছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

প্রাথমিকভাবে তারা নিশ্চিত সজলের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। ঘটনাস্থল নগরীর কালীবাড়ি সড়কে মমতা স্পেশালাইজড হাসপাতালের বেশ কয়েকজন কর্মচারীদের সন্দেহের চোঁখে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে। লিফটের নিচে লাশ রয়েছে দেখলো কে? সেই প্রশ্নকে সামনে রেখে ঐ ব্যক্তিই সম্ভাবত ঘটনার কম বেশি অবগত এমনটি মনে করে তার কাছ থেকে তথ্য আদায়ের চেষ্টা চলছে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সজলের পরিবারের দাবি, নগদ অর্থের লোভে তাকে ওই ক্লিনিকের কর্মচারীদের মধ্যেকার কেউ এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত। ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার দিনের শেষে বিকেলে সজরের মৃতদেহ শেবাচিম হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তার আবাসস্থল ঢাকার কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, শেবাচিম সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. জহিরুল ইসলাম মানিকের মালিকাধীন মমতা স্পেশালাইজড হাসপাতালের লিফটের নিচের কক্ষ থেকে সজলের লাশ মঙ্গলবার সকালে উদ্ধার করা হয়।

 

 

এর আগে সোমবার সন্ধ্যা থেকে এই চিকিৎসক নিখোঁজ ছিলেন। তিনি শেবাচিম হাসপাতালে বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত থাকার পাশাপাশি ডা. জহিরুল ইসলাম মানিকের ক্লিনিকে বৈকালিক সময় রোগী দেখতেন। সুসজ্জিত বহুতল ভবন বিশিষ্ট ওই ক্লিনিকের দ্বিতীয় তলায় তার নিজস্ব চেম্বার রয়েছে। থাকতেন সপ্তম তলার ৮ নম্বর কক্ষে। সরেজমিন ঘুরে যে তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে তাতে জানা যায়, ডা. সজল ক্লিনিকের বেশ কয়েকজন কর্মচারীর সাথে ম্যাচে রান্না থাকার তিন বেলা খেতেন। ঘটনার দিন সোমবার বিকালে তাকে স্বাভাবিক দেখা গেছে।

 

কয়েকজন রোগী দেখার পর বিকালে নিচে নেমে নিজেই বাজার করে ক্লিনিক সংশ্লিষ্ট ওষুধের দোকানে কর্মরত হাসান নামক যুবকে কাছে তা পৌছে দেয়। তার থাকার রুমে যাওয়ার কথা বলে সেখানে ইফতারি নিয়ে আসার জন্য হাসানকে নির্দেশ দিয়ে তিনি ওই ক্লিনিকে প্রবেশ করেন। এই যুবকের ভাষ্য হচ্ছে, কিছু সময় পর ইফতার সামগ্রী নিয়ে তার আসাবন কক্ষে গিয়ে দেখা যায় তালাবদ্ধ। তার সন্ধান না পাওয়ায় ইফতার সামগ্রী দরজার সাথে ঝুলিয়ে রেখে আসে।

 

ধারণা করা হয়েছিল, সম্ভাবত ডা. সজল অপারেশন থিয়েটারে রয়েছেন। ক্লিনিকের একটি সূত্র জানায়, এই সময় একজন রোগীর অপারেশন চলছিল। কিন্তু রাতের খাবার পৌছে দিতে একই যুবক পুনরায় তার কক্ষে গিয়ে সেই পূর্ব চিত্র বন্ধ এবং ইফতার দরজার সাথে ঝুলতে দেখতে পান। রাত বাড়ার সাথে সাথে শুরু হয় সজলের সন্ধান। কিন্তু কোথাও তার খোঁজ মেলেনি। হাসপাতালের অপর একটি সূত্র বলছে, ডা. সজলের এই নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষ অতটা গুরুত্ব দেয়নি। সকালেও তার সন্ধান না পাওয়ায় শুরু হয় জোর তাল্লাশ। এক পর্যায় লিফটের নিচে কোন কর্মচারী তার লাশ দেখতে পায়। এর হৈচৈ পরে যায়, পুলিশ প্রশাসনে শুরু হয় তোলপাড়।

 

বরিশার স্বাস্থ্যখাতে এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এধরণের বিয়োগান্তের ব্যাতিক্রমী ঘটনায় বিষয়টি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। যার দরুন দেখা যায় বরিশাল জেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব শাখার কর্মকর্তাসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। সেই সাথে মিডিয়াকর্মীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। খবর পেয়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে পরে গোটা ক্লিনিক সমূখ্য। একজন চিকিৎসকের মৃতদেহ লিফটের নিচে উদ্ধারের খবর মুহূর্তে গোটা নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে এই ঘটনার নেপথ্যের রহস্য নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

 

খবর পেয়ে ডা. সজলের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার পূর্ব সোহাগদল গ্রাম থেকে স্বজনেরা ছুটে আসেন। নিহত চিকিৎসকের চাচা আব্দুল করিমসহ অপরাপর স্বজনরা দাবি করে বলেন, এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, হত্যার শিকার হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যেকার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বরিশার মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোকতার হোসেন অনানুষ্ঠানিক মিডিয়াকে জানান, তারাও সন্দেহ করছে ঘটনার পিছনে ভিন্ন কিছু রয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে হত্যার আলামত হিসেবেই দেখছে। সজলের দুই পায়ের বিভিন্নস্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার পরিধিয় পোশাক ছিল ছিন্ন বিছিন্ন। শীর্ষ এই কর্মকর্তা মনে করেন লিফটের নিচে তার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সার্বিক আলমত বলছে তাকে ক্লিনিকের ভিতরেই হত্যার পর লাশ লুকিয়ে রেখে ঘটনা ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে ওই স্থানে রাখা হয়। সম্ভাবত গভীর রাতে ঘটে এই ঘটনা।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার এক্সপাট টিম ঘটনাস্থলে সার্বিক আলমত দেখে অভিন্নমত পোষণ করেন। সবার ধারণা কারো একার পক্ষে তাকে হত্যা করে লিফটের নিজে নিয়ে যাওয়া সম্ভাব নয়। সাথে আরো দুই একজন থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত যে, ক্লিনিকের বাহিরে থেকে এসে কারো পক্ষে এ ঘটনা সংঘটিত করা সম্ভাব নয়। তদুপরি সবকিছু এখনই নিশ্চিত করে বলে যাচ্ছে না। নিহতের চাচা আব্দুল করিম ও ছোট ভাই উচ্ছ্বাসেরও একই দাবি তাকে হত্যা করা হয়েছে। গত দুইমাস যাবত করোনা দূর্যোগে ঢাকার পরিবারের সাথে মিলিত হতে না পারায় এবং প্রতিদিন বিপুল নগদ উপার্জিত অর্থ নিজের কাছে রাখায় কেউ নিশ্চিত হয়েই তা লুণ্ঠনের চেষ্টায় তাকে আভ্যন্তরীণভাবে অপহরণ করে আটকে রেখে রাতে হত্যার পর হাসপাতাল কর্মচারীদের অলক্ষ্যে লাশটি ওই স্থানে লুকিয়ে রাখে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে সন্দিদ্বজনক মামলা দায়ের করেছে বলে নিহতের চাচা আব্দুর করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

 

হাসপাতাল বা ক্লিনিকটি আধুনিক করন করা হয়েও কোন সিসি ক্যামেরা না থাকার বিষয়টি রহস্যজনক। তাছাড়া রোগী ও কর্মচারীদের আসা যাওয়ার মাঝে একজন ব্যক্তি তাও সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের চিকিৎসককে হত্যা করে তাকে লুকিয়ে রাখার সময়কালে কারো চোঁখ ফাকি দেয়ার বিষয়টিও অসম্ভাব।

 

এই প্রতিবেদক রাত ৯টায় ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পায় পুলিশের বিভিন্ন টিম এখনো সেখানে অবস্থান করে জানার চেষ্টা করছে নেপথ্যের কাহিনী। কোতয়ালী মডেল থানার ওসি তদন্ত কর্মকর্তা মুকুল জানান, ওই রাতে ডিউটিরত ক্লিনিকের বিভিন্ন কর্মচারীকে পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তারা আশাবাদি দ্রুত ঘটনার রহস্য উম্মোচন সম্ভাব হবে। পুলিশের ভিতর থেকেই বলা হচ্ছে, ঘাতকরা বাহিরের কেউ নয়। তারা পুলিশের তোড়জোর দেখছে এবং সতর্কাবস্থান নিয়ে সবই প্রত্যাক্ষ করছে।

 

এদিকে বিকেলে ডা. সজলের ময়নাতদন্ত শেষে শেবাচিম মর্গের অদুরে মসজিদ সম্মুখে তার জানাজার নামাজে শেবাচিম ও মমতা ক্লিনিকের চিকিৎসক সহকর্মী থেকে কর্মচারীরা অংশ নেন। সন্ধ্যার পরে তার লাশ অ্যাম্বুলেন্স যোগে ঢাকার কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

 

সেখানে তার সমাধিস্থ করার কথা। নেছারাবাদের আদি বাসিন্দা হলেও স্বাধীনতা উত্তর ডা. সজলের পিতা প্রায়ত আব্দুল হালিম শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত থাকা অবস্থায় কেরানীগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসত গড়ে তোলেন। সেখানেই রয়েছে নিহতের স্ত্রী কহিনুর বেগম ও বড় কণ্যা তাসলিম নবম শ্রেণির ছাত্রী এবং চর্তুথ শ্রেণিতে অধ্যায়রত পুত্র তাবিব।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All Rights reserved © 2018 KhoborBarisal.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net